ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কামুর বিখ্যাত উপন্যাস “দ্য প্লেগ”-এ একটি শহরের আকস্মিক বিপর্যয়ের সূচনা ইঁদুরের অস্বাভাবিক উপস্থিতির মাধ্যমে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ওরান শহরের রাস্তায় ইঁদুরের দলবদ্ধ আগমনকে ধরা হয় আসন্ন মহামারীর অশনি সংকেত হিসেবে। একইভাবে জর্জ অরওয়েলের “১৯৮৪” উপন্যাসে ইঁদুরকে মানুষের গভীরতম ভয় ও মানসিক নির্যাতনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সাহিত্যকর্মে ইঁদুর শুধু প্রাণী নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের রূপক।
আজকের ঢাকা শহরের বাস্তবতায় সেই প্রতীকী উপাদান যেন এক বাস্তব রূপ ধারণ করেছে। নগরীর অলিগলি, বাজার, আবাসিক এলাকা, ড্রেন ও বহুতল ভবনের ভেতরে ইঁদুরের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে বলা হচ্ছে, ইঁদুরের কারণে শহরে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে এবং অন্তত ষাটের বেশি ধরনের রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা, প্রায় চারশ বছরের পুরোনো এই মহানগর, আজ অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক বিশাল রূপ নিয়েছে। উঁচু ভবন, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল এবং আধুনিক সড়কব্যবস্থার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ বর্জ্য ও নিকাশী জগৎ, যা ইঁদুরের জন্য আদর্শ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি শহরটিকে অনেকটাই এক “রূপান্তরিত নগর” হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে কংক্রিটের নিচে গড়ে উঠছে এক নীরব সমান্তরাল জগত।
নিচের সারণিতে ঢাকা শহরে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি ও তাদের প্রভাব তুলে ধরা হলো—
| নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি | সম্ভাব্য কার্যকারিতা | সীমাবদ্ধতা |
|---|---|---|
| বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন | অত্যন্ত উচ্চ | দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন প্রয়োজন |
| প্রাকৃতিক শিকারি বৃদ্ধি | মাঝারি থেকে উচ্চ | নগর পরিবেশ সীমাবদ্ধতা |
| রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ | তাৎক্ষণিক কার্যকর | পরিবেশ ও প্রাণীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ |
| আধুনিক ফাঁদ ও প্রযুক্তি | উচ্চ | ব্যয়বহুল |
| জনসচেতনতা বৃদ্ধি | দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ | ধীর প্রভাব |
পরিবেশগত ভারসাম্যের অবক্ষয়ও এই সমস্যাকে তীব্র করেছে। শহর থেকে কাক, চিল এবং পেঁচার মতো প্রাকৃতিক বর্জ্যভুক ও শিকারি পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ায় ইঁদুরের প্রজনন নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক চক্র ভেঙে পড়েছে। একইভাবে জলাশয় ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় গুইসাপ, নেউল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শিকারির উপস্থিতিও হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। খোলা ডাস্টবিন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যবর্জ্য এবং দীর্ঘ সময় ধরে আবর্জনা পড়ে থাকা ইঁদুরের জন্য সহজ খাদ্যভাণ্ডার তৈরি করছে। ফলে শহরের নিচের অংশে গড়ে উঠছে এক বিশাল অদৃশ্য জনপদ, যা উপরের নগরজীবনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।
আন্তর্জাতিক উদাহরণে দেখা যায়, উন্নত শহরগুলো আধুনিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, স্বয়ংক্রিয় ডাস্টবিন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং প্রজনন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কিছু শহরে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিড়াল ও শিকারি প্রাণীর ব্যবস্থাপনাও করা হয়।
তবে ইঁদুর পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, কারণ পরিবেশ ব্যবস্থায় এদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবেষণা, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং খাদ্যশৃঙ্খলে ইঁদুর একটি অপরিহার্য প্রাণী। অসংখ্য বন্যপ্রাণীর খাদ্য হিসেবে এদের ভূমিকা এবং বীজ বিস্তারে সহায়তা নগর ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা শহরের বর্তমান সংকট তাই একপাক্ষিক উন্নয়নের প্রতিফলন। নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনঃস্থাপন ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, বরং একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ।
