জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৫২ পিএম

রাজধানীর খুব কাছেই কেরানীগঞ্জ উপজেলা। এই শান্ত এলাকাটি হঠাৎ করেই এক অজানা আতঙ্কে থমথমে হয়ে পড়েছে। মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে একের পর এক সাতজন মানুষের প্রাণহানি ও লাশ উদ্ধারের নির্মম ঘটনা ঘটেছে এখানে। খবরগুলো যেন থামছেই না। এর মধ্যে ছয়জনের মরদেহ পুলিশ বিভিন্ন ঝোপঝাড়, পরিত্যক্ত জমি ও বাসা থেকে সরাসরি উদ্ধার করেছে। অন্য ঘটনাটিতে এক রক্তাক্ত কিশোরকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তবে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরপর এসব রক্তক্ষয়ী ঘটনা পুরো কেরানীগঞ্জের ঘরে ঘরে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষের সন্ধ্যার পর স্বাভাবিক চলাফেরা কমে গেছে, দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। চারপাশের এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে এবং জনমনে ভরসা যোগাতে ইতোমধ্যে পুরো উপজেলায় ১৫ দিনের বিশেষ অভিযানে নেমেছে পুলিশ।
কেরানীগঞ্জের দুই থানা এলাকা—কেরানীগঞ্জ মডেল ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ জুড়ে এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার শুরুটা হয়েছিল মডেল থানার খোলামোড়া এলাকায় রুহুল আমিন (৪০) নামের এক যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে। ঋণে জর্জরিত হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
এর ঠিক পরদিন, ২৬ জুলাই সকালে খোলামোড়া মডেল টাউনের রসুলবাগ এলাকার একটি মসজিদের কাছ থেকে মমতাজ (৩০) নামের এক তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনার রেশ না কাটতেই ২৮ জুলাই সকালে কালিন্দি ইউনিয়নের গ্রীন সিটি সংলগ্ন বালুরমাঠের পাশে তানজিলা (১৭) নামের এক কিশোরীর গলাকাটা লাশ দেখে চমকে ওঠে স্থানীয়রা।
ঠিক তার দুদিন পর, ৩০ জুলাই সকালে হযরতপুর ইউনিয়নের ভাটারাকান্দি গ্রামে নিজ বাড়ির পাশ থেকেই অটোরিকশাচালক লিয়াকত আলীর (৬০) নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা এলাকাতেও পরিস্থিতির কোনো ব্যতিক্রম ছিল না। ৩১ জুলাই সকালে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের নির্জন ও পরিত্যক্ত প্লটের ঝোপঝাড় থেকে হাসিনা বেগম (৬৫) নামের এক বৃদ্ধার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ছিলেন।
একই দিন দুপুরে আগানগর পাওয়ার হাউজ মোড়ে একটি চায়ের দোকানের সামনে ঘটে আরেক তুচ্ছ অথচ নৃশংস ঘটনা। ধূমপান করা নিয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে হাসান (১৭) নামের এক কিশোরকে প্রকাশ্যেই ছুরিকাঘাত করা হয়। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
সবশেষ গত ১ আগস্ট বিকেলে দোলেশ্বর আদ-দীন হাসপাতালের পেছনের একটি পরিত্যক্ত ইটভাটার ঝোপ থেকে চাঁন মিয়া গাজী ওরফে চান্দু (৬৫) নামের এক নির্মাণশ্রমিকের লাশ পাওয়া যায়।
টানা এতগুলো মানুষের মৃত্যুর খবরে স্থানীয়রা একটি সুসংগঠিত সন্ত্রাসী চক্রের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করছিলেন। তবে পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। পুলিশের মতে, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন এবং এর পেছনে কাজ করেছে ব্যক্তিগত কলহ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও মারাত্মক সামাজিক অবক্ষয়।
কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিলুল হক জানান, প্রতিটি ঘটনার পটভূমি আলাদা এবং অধিকাংশই ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে ঘটেছে। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলাগুলোর অগ্রগতি বেশ দ্রুতই এগোচ্ছে:
তরুণী মমতাজ হত্যার প্রধান অভিযুক্ত মিন্টুকে ইতোমধ্যে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
কিশোরী তানজিলার নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় তার প্রেমিক রানাকে আটক করা হয়েছে।
অটোরিকশাচালক লিয়াকত আলী খুনের ঘটনায় তদন্তে নেমে পুলিশ তারই নিজের ছেলে ফারুককে গ্রেপ্তার করেছে।
আগানগরে কিশোর হাসানকে ছুরিকাঘাতে হত্যাকারীদের ধরতে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।
অন্যদিকে নির্মাণশ্রমিক চাঁন মিয়া গাজীর মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সন্দেহভাজন একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
কেরানীগঞ্জের প্রতিটি অলিগলিতে নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং সাধারণ মানুষের ভয় দূর করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঢাকা জেলা পুলিশ।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, “প্রতিটি অপরাধের পেছনে জড়িতদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাতে আমাদের টিমগুলো নিরলস কাজ করছে। এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে আমরা ইতোমধ্যে ১৫ দিনের একটি জোরদার বিশেষ অভিযান শুরু করেছি।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, কেবল পুলিশি অভিযান চালিয়ে রাতারাতি এমন অপরাধ বন্ধ করা কঠিন, যদি না সামাজিক সচেতনতা বাড়ে। সেজন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, অভিভাবক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মহল্লায় মহল্লায় সচেতনতামূলক আলোচনা করা হবে। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত যেকোনো ছোট দ্বন্দ্ব যেন আর কোনো প্রাণ না কেড়ে নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য