জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৪০ এএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় নতুন শান্তি ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রূপরেখা ঘোষণা করছিলেন, ঠিক তখনই ভূখণ্ডটিতে নতুন করে তীব্র বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সূত্রমতে, এই সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৯ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যা বিগত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ নিহতের রেকর্ড। একইসঙ্গে হাসপাতাল সংলগ্ন ওষুধ গুদামে হামলার ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নতুন বিপর্যয় নেমে এসেছে।
Table of Contents
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও স্থানীয় চিকিৎসা সূত্রগুলো জানিয়েছে, রোববার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় গাজার উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত বিভিন্ন আবাসিক ভবন, বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু ও যানবাহন লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
আল-শিফা হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম গাজা শহরের আল-সুসি টাওয়ারের একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত হন। নিহতরা হলেন ৩৩ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আবু তাইফ, তার ২৯ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির আনান এবং তাদের মাত্র পাঁচ বছর বয়সী শিশুপুত্র আজ্জাম।
দক্ষিণের খান ইউনিস শহরের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত আল-কারারা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় আল-হামস পরিবারের তিন সদস্য—মাহমুদ (৩৮), তার স্ত্রী ফাতিমা (৩৭) এবং তাদের ছোট মেয়ে নিহত হন। নাসের হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, এই হামলায় পরিবারের আরও তিনজন সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় নিজ বাড়িতে হামলায় প্রাণ হারান ৬৮ বছর বয়সী প্রবীণ নাগরিক কামু আবু মুয়াইলিক ও তার ৫৯ বছর বয়সী স্ত্রী হুদা। একই এলাকায় মোটরসাইকেলে যাতায়াতের সময় ইসরায়েলি হামলায় দুই ভাই নিহত হন। এছাড়া উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে বিমান হামলায় একজন, গাজা শহরের রেমাল মহল্লায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে ড্রোন হামলায় এক শিশুসহ দুইজন এবং গাজার অন্য স্থানে একটি চলন্ত গাড়িতে হামলায় আরও চারজন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান।
শুধু আবাসিক অঞ্চলেই নয়, শনিবার থেকে দেইর আল-বালাহের আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের চিকিৎসা সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুর্শ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ধ্বংসের মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত ‘রোগ ও প্রয়োজনীয় ওষুধকেই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে’। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরায়েলি হামলায় দুটি মূল ওষুধ সংরক্ষণাগার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আরও দুটি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রস্তাবিত ‘যুদ্ধবিরতি’ বাস্তবায়নের জন্য বোর্ড অব পিস এবং ইন্টারন্যাশনাল স্টাবিলাইজেশন ফোর্সের সঙ্গে যৌথভাবে একটি আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জানা গেছে, সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস এই শান্তি চুক্তির বিস্তারিত রূপরেখা গ্রহণে সম্মতি প্রকাশ করেছে। তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি, বরং ভূখণ্ডজুড়ে সামরিক অভিযানের মাত্রা আরও বাড়ানো হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে কাতার, মিশর এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবে গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধিত পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়/সূচক | বিবরণ/পরিসংখ্যান |
| সর্বশেষ একদিনে মোট নিহত (রোববার) | ১৯ জন |
| আল-সুসি টাওয়ারে হামলায় নিহত | ৩ জন (আব্দুল্লাহ, আবির ও শিশু আজ্জাম) |
| আল-কারারা অ্যাপার্টমেন্টে নিহত | ৩ জন (মাহমুদ, ফাতিমা ও তাদের কন্যা) |
| আল-কারারা অ্যাপার্টমেন্টে আহত | ৩ জন |
| দেইর আল-বালাহে বাড়িতে নিহত | ২ জন (প্রবীণ দম্পতি কামু ও হুদা) |
| দেইর আল-বালাহে মোটরসাইকেলে নিহত | ২ জন (দুই ভাই) |
| জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে নিহত | ১ জন |
| রেমাল মহল্লায় তাঁবুতে নিহত | ২ জন (এক শিশুসহ) |
| যানবাহনে (গাড়িতে) হামলায় নিহত | ৪ জন |
| অক্টোবর ২০২৫ পরবর্তী মোট ফিলিস্তিনি নিহত | ১,২২২ জন |
| অক্টোবর ২০২৫ পরবর্তী মোট ফিলিস্তিনি আহত | ৪,০৫৩ জন |
| ক্ষতিগ্রস্ত চিকিৎসা গুদাম (আল-আকসা হাসপাতাল) | ৪টি (২টি সম্পূর্ণ ধ্বংস, ২টি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত) |
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের শান্তি প্রতিষ্ঠার নিরন্তর চেষ্টার মধ্যেও গাজার ভূখণ্ডজুড়ে প্রতিদিন প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হচ্ছে।
মন্তব্য