সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ৭:৬ পিএম

জাতীয় নির্বাচনে জয় লাভ করে নতুন একটা সরকার গঠন করার পর নবগঠিত সরকারের প্রধান প্রতিবেশী দেশ ভ্রমণ করার একটা প্রথা চালু আছে অনেক বছর ধরেই। এই প্রথাকে একটা বৈশ্বিক সংস্কৃতি বলা যায়। ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই এমন প্রথা চালু আছে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনে জয় লাভ করে সরকার গঠনের পর চার মাস পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এমন কোন সফর পরিকল্পনা করতে পারছিলেন না। প্রথমে শোনা যাচ্ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে যাবেন। কেউ কেউ বলছিল চীন হবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। তারপর শোনা গিয়েছে যে তিনি নেপাল কিংবা ভুটান থেকে তাঁর বিদেশ সফর শুরু করবেন। তারপর শুনেছি সৌদি আরব হতে পারে প্রধনমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর। আলোচনা হচ্ছিল অনেক, দাওয়াত পাওয়া যাচ্ছিল না কোন দেশ থেকে। ক্ষমতা গ্রহণের পর চার চারটে মাস পার হয়ে যাওয়ার পরেও যখন কোন দেশ ভ্রমণের দাওয়াত পাওয়া যাচ্ছিল না তখন নতুন সরকারের ভাবমুর্তির পারদ দর দর করে নামতে শুরু করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে একদিন জানা গেল যে, তিনি দাওয়াত পেয়েছেন, তবে সেটা ভারত, সৌদি আরব বা চীন নয়। প্রথমে মালয়েশিয়া যাবেন তারপর সেখান থেকে চীন। প্রথম সফর সরাসরি চীনে না করে একটু ঘুরিয়ে পেচিয়ে তার পর উনি চীন গেলেন।
বর্তমান প্রধনমন্ত্রীর মা এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর। তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতে লেখা শোক বার্তা। তারপর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে সফররত ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে পুর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ অনুষ্ঠান তৎকালীন বিরোধীদলণীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাতিল করলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সম্পর্কে বরফ জমতে শুরু করে। সেই থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৩ বছরে এ সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কোন পক্ষ থেকেই তেমন কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। উল্টো ভারত বিরোধী ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে বিএনপি এবং তাদের এককালের জোট সঙ্গী এবং আজন্ম রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী। ভারত এবং বিএনপির সেই শীতল সম্পর্কের প্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে বেগম জিয়ার জানাজার দিনে সামরিক বিমান যোগে সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করে স্বশরীরে ঢাকায় এসে বেগম জিয়ার স্মৃতির প্রতি জয়শংকরের ভারতের জনগণের শোক এবং শ্রদ্ধা নিবেদন এবং শপথ অনুষ্ঠানে লোক সভার স্পিকারের যোগদান কূটনীতি বিষয়ে সচেতন মহলে কৌতূহলের সৃষ্টি করেছিল। ভারতের উচ্চ পর্যায় থেকে এই দুই সফর ২৪ পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিএনপির প্রতি ভারতের দৃষ্টি ভঙ্গি বদলের এবং আগামী দিনে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরির আমন্ত্রণ হিসেবে গণ্য করেন অনেকেই।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক মহলে এ কথাও আলোচিত হয়েছিল যে, তারেক রহমান যখন মৃত্যু শয্যায় থাকা মাকে দেখতে নিজ সিদ্ধান্তে লন্ডন থেকে আসতে পারছিলেন না তখন তাঁর দেশে ফেরানোর জন্য পর্দার আড়ালে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ভারত ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তীতে নতুন সরকার গঠন করে এবং নতুন সংসদে জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে একত্রিত হবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শোক প্রকাশ এবং ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার অধ্যাদেশকে সংসদের মাধ্যমে আইনে পরিণত করার ঘটনা তারেক সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আবারো শীতল করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে দিল্লী সফর করেও বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের পক্ষে তারেক রহমানের জন্য ভারত সফরের দাওয়াত জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে নেপাল এবং ভুটান ভারতের অসম্মতিতে যে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানাবে না তা আঞ্চলিক রাজনীতি সচেতন সকলে সহজেই বুঝে নিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ড. ইউনুসের বন্ধু এবং আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার, বঙ্গবন্ধু অনুরক্ত মাহাতির মোহাম্মদের গুরুমারা শিষ্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের দাওয়াত পাওয়া অনেক সহজ ছিল। বেইজিং গিয়ে খলিলুর রহমান ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’ শীর্ষক সম্মেলনের সাইড লাইনে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটা এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আরেকটা বৈঠকের এপয়েন্টমেন্ট করে আসতে পেরেছিলেন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরুর এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) আলোচনা ত্বরান্বিতকরণ করার আশ্বাস নিয়ে চীনে রওনা হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীনে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সংবাদ পাওয়া গেল যে “শিগগির খুলছে না মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার।’
বেইজিং যাওয়ার বেশ কিছু দিন আগে থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছিল যে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিস্তা ব্যার্যাজ নির্মানের জন্য চীনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হবে। এমন কি ২৫ জুন চীনা পানিসম্পদ মন্ত্রী লি কোয়াইং এর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম শিরোনাম করে জানায় যে তিস্তাসহ নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐক্যমত্য পোষণ করেছে। বাস্তবে দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বহুল আলোচিত তিস্তা ব্যারেজ নিয়ে কোন চুক্তি হয়নি। সীমান্তের কাছে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য স্পর্শকাতর বিষয়। তারা চায় এ প্রকল্প তারা নিজেরা বাস্তবায়ন করবে। চীনও তাই চায়। সীমান্তের কাছের এ প্রকল্পে ভারত কোনভাবেই তাঁদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে ঘেষতে দিতে চায় না। বিশ্ব মোড়ল এবং তারেক সরকারের স্পন্সর আমেরিকাও চায় না যে চীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নাক গলাক। এই ইস্যুতে ভারত এবং আমেরিকা একই অবস্থানে। স্পন্সরকে অখুশি করে তিস্তা প্রকল্প চিনকে দেয়া তারেক সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় – এ কথা শুধু চীন নয়, আঞ্চলিক রাজনীতির খোজ-খবর রাখেন এমন সকলে তা জানে এবং বোঝে। তাই এ নিয়ে চীনা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোন আলোচনাও হয়নি। আমাদের গণমাধ্যম শুধু মাঠ গরম করে খবর বেচে টুপাইস কামিয়েছে মাত্র।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে অন্য কোন ক্ষেত্রে কোন একটি প্রকল্প চুক্তিও স্বাক্ষর হয়নি। তাঁর এই সফরের ফলে ১টি ইউয়ানও বাংলাদেশে আসবে না। বিনিয়োগ কিংবা প্রকল্প সহায়তা কোন খাতেই নয়। বেসরকারি খাতেও কোন বিনিয়োগ চুক্তি হয়নি। এ সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের হয়েছে ১৬টি সমঝোতা স্মারক সই। আর একটি সমঝোতা হয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিএনপি’র মধ্যে। সমঝোতা স্মারকে কোন অঙ্গীকার বা দায়বদ্ধতা থাকে না। ওগুলো বাংলাদেশ সরকারের মুখরক্ষা করার জন্য লোক দেখানো সৌজন্য মাত্র।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এতটা অবনতি আগে কখনোই হয়নি। বহু বছর ধরে চীন সব সময় কোন না কোন প্রকল্পে সহায়তা এবং বিনিয়োগ করেছে। চীনের কিংবা বাংলাদেশের নেতাদের সফরে সব সময় একাধিক প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এবারই ব্যতিক্রম। ২০১৬ সালে চীনা রাষ্ট্রপতির ঢাকা সফরকালে এক দিনে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বাক্ষর হয়েছিল ২০ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন প্রকল্প সহায়তা চুক্তি। চীনা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তখন ঢাকায় এসেছিল সে দেশের অনেক ব্যাবসায়ীও। তাঁরাও বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনেক বাণিজ্যিক এবং বিনিয়োগ চুক্তি সাক্ষর করেছিলেন যার মূল্য ছিল ১২/১৩ বিলিয়ন ডলার।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণ আমেরিকার সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি যাকে অনেকই আজকাল “উপনিবেশ চুক্তি” হিসেবে আখ্যায়িত করছে। উপনিবেশ চুক্তির আর্টিকেল ৪.৩ এর ৪ নম্বর ধারায় চীনের নাম উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি কোন অ-বাজার অর্থনীতির (non-market economy, viz., China) সঙ্গে কোন দ্বি-পাক্ষিক করমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কিংবা অগ্রাধিকারযুক্ত অর্থনৈতিক চুক্তি করে যা আমেরিকার স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্থ করে তবে উপনিবেশ চুক্তি বাতিল হবে এবং আমেরিকা বাংলাদেশের রফতানির উপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। আমেরিকার সঙ্গে এমন চুক্তি বলবৎ থাকার সময় চীন কি আর কোন অগ্রাধিকারযুক্ত অর্থনৈতিক (কম সুদ, বিনামূল্যে প্রাতিষ্ঠানিক এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা, ইত্যাদি) চুক্তি করতে পারে? বাংলাদেশও পারে না।
জামায়াত ও বিএনপির প্রকাশ্য সম্মতিতে ড. ইউনুস সরকারের করা উপনিবেশ চুক্তি যতকাল বলবৎ থাকবে ততকাল চীন, রাশিয়া এবং আমেরিকা পছন্দ করে না এমন কোন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কোন বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক চুক্তি করা যাবে না। বাংলাদেশকে শুধু আমেরিকার উপনিবেশ হয়েই থাকতে হবে। তাঁদের ইচ্ছেতেই চলতে হবে।
২৭ জুন ২০২৬
কলাবাগান, ঢাকা।
সাব্বির আহমেদ, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।
মন্তব্য