জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ৫:৩১ পিএম

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৮৭২ জন। সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও জোরদার করার পাশাপাশি দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা এবং অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শনিবার (১ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম প্রকাশিত সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোনো নতুন ঘটনা নিবন্ধিত হয়নি। মারা যাওয়া তিন শিশুর মধ্যে একজন সিলেট বিভাগের, একজন ময়মনসিংহ বিভাগের এবং একজন রংপুর বিভাগের বাসিন্দা।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংক্রমণ পরিস্থিতির ১৩৯ দিনে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৮৪০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং পরীক্ষাগারে সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে ৯৬ শিশু। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি হওয়া থেকে বোঝা যায় যে অনেক রোগীকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আনা হচ্ছে অথবা পরীক্ষার আগেই তাদের অবস্থার অবনতি ঘটছে। এতে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত হওয়া ৮৭২ জনের মধ্যে ৬৮৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ৫৩৮ জন শিশু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। ফলে এখনো দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৬১ জন। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৬ হাজার ১৮০ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৬৭৪ জন রোগী এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ৭ হাজার ৩৯৭ জন।
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ শুরুর তারিখ | ১৫ মার্চ |
| পর্যবেক্ষণের সময়কাল | ১৩৯ দিন |
| গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত | ৮৭২ জন |
| গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি | ৬৮৭ জন |
| গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র | ৫৩৮ জন |
| গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু (উপসর্গে) | ৩ শিশু |
| মোট সন্দেহভাজন রোগী | ১,২৯,০৬১ জন |
| পরীক্ষায় নিশ্চিত আক্রান্ত | ১৬,১৮০ জন |
| মোট হাসপাতালে ভর্তি | ১,১১,৬৭৪ জন |
| চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে | ১,০৭,৩৯৭ জন |
| মোট মৃত্যু | ৮৪০ শিশু |
| উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু | ৭৪৪ শিশু |
| পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পর মৃত্যু | ৯৬ শিশু |
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের নিঃসৃত ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে রোগটি খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে দানা ওঠা হামের প্রধান লক্ষণ। সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, অপুষ্টি, কানের সংক্রমণ এবং বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের জটিল প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, হামের বিস্তার রোধে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া, প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি করা এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শিশুদের জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে লালচে দানা ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিলে যেন দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যোগাযোগ করা হয়। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্য