খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ১২:৩ এএম

নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলায় ফাহিমা আক্তার রিফা (১৮) নামে এক নববধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে।
শনিবার (২০ জুন) বিকেলে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর নববধূর মরদেহটি পরবর্তী সৎকারের জন্য তাঁর পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে, গত শুক্রবার রাতে চাটখিল উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের সোমপাড়া গ্রামে অবস্থিত তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ।
Table of Contents
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ মার্চ সাহাপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তফদার বাড়ির মো. সালাউদ্দীনের মেয়ে ফাহিমা আক্তার রিফার সঙ্গে একই ইউনিয়নের প্রসাদপুর গ্রামের আমজাদ বেপারী বাড়ির মৃত কবির হোসেনের ছেলে ফয়সাল আহমেদের বিয়ে হয়। ফয়সাল আহমেদ পেশায় একজন সৌদি প্রবাসী।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পারিবারিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হলেও বিয়ের পর থেকেই এই নতুন দম্পতির দাম্পত্য জীবনে বিভিন্ন পারিবারিক বিষয় নিয়ে ক্রমাগত কলহ ও মানসিক দূরত্ব চলছিল। প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে রিফার প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হতো। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার রাতে শ্বশুরবাড়ির নিজ শয়নকক্ষে ফাহিমা আক্তার রিফাকে সিলিংয়ের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতর থেকে তাঁর নিথর মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনায় ফাহিমা আক্তার রিফার পরিবারের সদস্যরা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই রিফার ওপর তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজন বিভিন্ন অজুহাতে ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল।
নিহতের পিতা ও আত্মীয়-বন্ধুরা জানান, ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রবাসী স্বামী ফয়সাল আহমেদ তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে ফোন করে রিফাকে দ্রুত তাঁদের নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। এই খবর পেয়ে মেয়ের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যরা মুঠোফোনে কথা বললে রিফা অত্যন্ত আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছেন বলে তাঁদের কাছে মনে হয়।
মেয়ের এই আতঙ্কগ্রস্ত ও অস্বাভাবিক কণ্ঠস্বর শুনে পরিবারের লোকজন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে ছুটে যান এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন যে তাঁদের মেয়ে আর বেঁচে নেই। পরিবারের দাবি, রিফাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার পর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে।
অন্যদিকে, নিহতের দেবর আকাশ ঘটনার সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে জানান যে, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। তখন সৌদি আরব থেকে তাঁর প্রবাসী ভাই ফয়সাল আহমেদ তাঁকে ফোন করে জানান যে রিফার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ভাইয়ের ফোন পেয়ে আকাশ তাৎক্ষণিকভাবে রিফার কক্ষের সামনে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান যে ঘরের উভয় পাশের দরজাই ভেতর থেকে শক্তভাবে বন্ধ করা রয়েছে।
কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ অনেকক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করেন এবং দরজায় বারবার আঘাত করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও ভেতর থেকে রিফার কোনো ধরনের সাড়াশব্দ বা সাড়া না পেয়ে তিনি একপর্যায়ে স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ঘরের ভেতরে ঢুকে তিনি রিফাকে কক্ষের সিলিংয়ের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান এবং পরবর্তীতে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে তাঁকে নিচে নামিয়ে আনা হয়।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিষয়ে চাটখিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মোন্নাফ গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল ও তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে যে, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত পারিবারিক কলহের জের ধরেই মূলত ওই গৃহবধূ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
এই মৃত্যুর ঘটনায় চাটখিল থানায় আইন অনুযায়ী একটি নিয়মিত অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরও জানান, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে নিহতের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি তাঁর স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক ও প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য