জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৮ এএম

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশন (জেবিসি) তাদের সহযোগী বিমা–সুবিধা বা ‘রাইডার’ প্রদানে কঠোর ও অভিন্ন নীতিমালা জারি করেছে। এখন থেকে পূর্বে বিদ্যমান কোনো গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত জনগোষ্ঠী এবং স্বাস্থ্যগত তথ্য গোপনকারী বিমাগ্রহীতারা আর রাইডার সুবিধার সুযোগ পাবেন না। একই সঙ্গে এই অতিরিক্ত সুরক্ষা সুবিধা পেতে বিমাগ্রহীতাকে বাধ্যতামূলকভাবে নিজস্ব স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এবং প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
মূল জীবনবিমা পলিসির ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বিমা দাবি নিষ্পত্তিতে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই জেবিসি গত ২৬ জুলাই এই ১৪ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। ইতোমধ্যে করপোরেশনের সব আঞ্চলিক, করপোরেট, বিক্রয় ও শাখা কার্যালয়কে এই আদেশ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
Table of Contents
সহযোগী বিমা বা রাইডার মূলত কোনো পৃথক বা স্বতন্ত্র বিমা পলিসি নয়। এটি মূল জীবনবিমা চুক্তির সাথে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম সাপেক্ষে যুক্ত একটি সম্পূরক সুবিধা, যা বিমাগ্রহীতার ঝুঁকির কাভারেজ অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়।
বাস্তব উদাহরণ: ধরুন, একজন গ্রাহকের ২০ লাখ টাকার মূল জীবনবিমা রয়েছে। তিনি যদি অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দিয়ে ১০ লাখ টাকার ‘দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু রাইডার’ যুক্ত করেন, তবে দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর মনোনীত ব্যক্তি (নমিনি) মূল বিমার ২০ লাখ এবং রাইডারের ১০ লাখসহ মোট ৩০ লাখ টাকা পাবেন।
বর্তমানে জেবিসি মূল পলিসির সাথে প্রধানত তিনটি রাইডার সুবিধা প্রদান করে:
স্বাস্থ্যবিমা (Health Insurance): চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য।
গুরুতর রোগ বিমা (Major Diseases Coverage): নির্দিষ্ট জটিল ও প্রাণঘাতী রোগের আর্থিক সুরক্ষায়।
প্রিমিয়াম মওকুফ সুবিধা (Waiver of Premium): অক্ষমতার কারণে প্রিমিয়াম দিতে না পারলে মূল বিমা চালু রাখার সুবিধার্থে।
জেবিসির প্রকাশিত নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, কেবল সম্পূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক এবং কর্মক্ষম ব্যক্তিরাই এই রাইডার সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
গুরুতর ব্যাধিতে বিধিনিষেধ: ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া, লিভার সিরোসিস, পক্ষাঘাত, এইচআইভি/এইডস, কিংবা জন্মগত ও অনিয়ন্ত্রিত দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই সুবিধা পাবেন না।
চিকিৎসা ইতিহাস ও পরীক্ষা: গত দুই বছরের মধ্যে গুরুতর কোনো রোগের কারণে হাসপাতালে ভর্তি বা চিকিৎসাধীন থাকার ইতিহাস থাকলে, জেবিসির চিকিৎসকদের বিস্তারিত মূল্যায়ন ছাড়া রাইডার মিলবে না। শারীরিক যোগ্যতা প্রমাণে লিপিড প্রোফাইল, সিরাম ক্রিয়েটিনিনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শারীরিক অক্ষমতা ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা: আংশিক বা স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাস্থ্যবিমা ও প্রিমিয়াম মওকুফ সুবিধা পাবেন না। একইভাবে, বিপজ্জনক খেলাধুলা, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ চাকরি বা পেশায় নিয়োজিত কর্মীরাও এই রাইডারের আওতাভুক্ত হবেন না।
বিমা চুক্তির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো ‘সর্বোচ্চ সদ্বিশ্বাস’। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গ্রাহককে তাঁর অতীত ও বর্তমান রোগের ইতিহাস এবং ডাক্তারের পরামর্শ সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রকাশ করতে হবে। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো তথ্য গোপন করা হয় বা ভুল তথ্য প্রদান করা হয়, তবে বিমা দাবি সরাসরি বাতিল করা হবে এবং প্রচলিত আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া, রাইডার সেবাটি যেহেতু মূল বিমা পলিসির ওপর নির্ভরশীল, তাই মূল পলিসিটি সারেন্ডার (সমর্পণ), ল্যাপস (স্থগিত) বা বাতিল হলে সহযোগী রাইডার সুবিধাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে রদ হয়ে যাবে।
বর্তমানে জীবন বীমা করপোরেশনে কোনো নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেই। একই সাথে জেবিসির চেয়ারম্যান মো. মোখলেস উর রহমান অতি সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাঈদ কুতুব পর্ষদ সদস্য হিসেবে এমডির অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রশাসনিক বিষয়ে সাঈদ কুতুব জানান, রাইডার সুবিধা নিয়ে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম হচ্ছিল। দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গ্রাহক ও কর্তৃপক্ষের মধ্যকার বিবাদ ও জটিলতা নিরসন করতেই এই কঠোর নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
জেবিসি সূত্রে জানা গেছে, এতদিন পর্যাপ্ত শারীরিক পরীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই অনেক শাখা রাইডার অনুমোদন দিচ্ছিল। এর ফলে গুরুতর রোগে আক্রান্ত গ্রাহকরা তথ্য গোপন করে সুবিধা গ্রহণ করছিলেন এবং পরবর্তীতে দাবি পরিশোধের সময় আইনগত বিরোধ তৈরি হচ্ছিল। নতুন এই নির্দেশিকা জেবিসির বিমা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্তব্য