,

ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্বের রূপান্তর: আন্তরিকতা বনাম অ্যালগরিদমের যুদ্ধ

শ্রাবণের মেঘলা আকাশে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর কাচঘেরা ক্যাফেতে তরুণ-তরুণীদের ভিড়—আজকের দিনটি যেন এক নতুন আবহে মোড়ানো। তবে ক্যাফের আড্ডার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দার দিকে তাকালেই চোখ পড়ে অসংখ্য ডিজিটাল বার্তা, পুরনো ছবির কোলাজ আর ভার্চুয়াল শুভেচ্ছায়। আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বন্ধু দিবস।

বাণিজ্যিক শুরু থেকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি

বন্ধু দিবসের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৩০ সালে বিশ্বখ্যাত ‘হলমার্ক কার্ডস’-এর প্রতিষ্ঠাতা জোয়েস হলের একটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা থেকেই দিনটির প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০১১ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনটিকে স্বীকৃতি প্রদান করে। তবে উদযাপনের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন ধারা লক্ষণীয়:

  • জাতিসংঘের ঘোষিত দিন: প্রতি বছরের ৩০ জুলাই।

  • আঞ্চলিক ও ঐতিহ্যগত উদযাপিত দিন: বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে আগস্ট মাসের প্রথম রোববার।

নব্বইয়ের স্মৃতি: নিখাদ উপস্থিতি ও সহনশীলতার বন্ধন

ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগার আগে নব্বই বা তার আগের দশকের বন্ধুত্বের দৃশ্যপট ছিল একেবারেই ভিন্ন। ভার্চুয়াল জগৎ ছিল না, ছিল সশরীরে হাজির থাকার নিবিড় অনুভূতি। বিকেল হলেই গলির মোড়ে বাইসাইকেলের পরিচিত বেল, পুরো পাড়ার জন্য ড্রয়িংরুমে রাখা ল্যান্ডফোনের রিসিভার ধরার প্রতিযোগিতা কিংবা পোস্টম্যানের হাতে আসা রঙিন চিঠির অপেক্ষায় থাকার মধ্যে ছিল খাঁটি ব্যাকুলতা।

বন্ধু দিবসের আগের রাতে প্রদীপের আলোয় খুব যত্ন করে রঙিন সুতো পেঁচিয়ে ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড’ বানানোর যে আবেগ ছিল, তা আজ অমূল্য। তখন সম্পর্কের মধ্যে মান-অভিমান হলে ‘ইনস্ট্যান্ট ব্লক’ বা ‘আনফলো’ করার মতো সহজ কিন্তু নিষ্ঠুর কোনো উপায় ছিল না। মেটাতে হলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলতে হতো। অপ্রতুলতার সেই যুগে ধৈর্যের শক্তিতে গড়ে উঠত আজীবন টিকে থাকার অনন্য বন্ধন।

অতি-সংযুক্তির যুগে একাকিত্ব ও জনস্বাস্থ্য সংকট

সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তি আজ আমাদের অসীম যোগাযোগের সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে বৈপরীত্য হলো—আজকের সমাজ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ‘কানেক্টেড’ হলেও মানবজাতি একই সাথে সবচেয়ে বড় একাকিত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। শারীরিক আড্ডার জায়গা দখল করে নিয়েছে এআই-চালিত মেসেজিং অ্যাপ, রিলস আর সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম।

আজকের তরুণের ফ্রেন্ডলিস্টে হয়তো শত শত বা হাজার হাজার বন্ধু, কিন্তু বাস্তব জীবনের কঠিন মুহূর্তে পাশে পাওয়ার মতো অকৃত্রিম মানুষের চরম অভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে ঘোষণা করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ক্ষতিকর প্রভাব দৈনিক ১৫টি সিগারেট পানের সমান স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।

ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়া বনাম মানবীয় সহমর্মিতা

বয়স বাড়ার সাথে সাথে জীবনের ব্যস্ততা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। সেখানে মন খুলে কথা বলার মতো একজন বন্ধু হতে পারে সবচেয়ে বড় মানসিক আশ্রয়। কিন্তু প্রযুক্তির ভিড়ে সে সম্পর্কও এখন খানিকটা যান্ত্রিক। জন্মদিনে একটি এআই-জেনারেটেড বার্তা বা ছবিতে ‘লাইক’ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হচ্ছে। তবে মুখোমুখি বসে মনের আগল খুলে কথা বলা কিংবা বিপদের দিনে পরম মমতায় হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অনুভূতি কোনো ইমোজি বা জিআইএফ দিয়ে পূরণ করা অসম্ভব।

প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক ও সম্পর্কের মূল সুর

তবে প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এখন ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে চিরতরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় নেই। মহাদেশের ওপারে থাকা বন্ধুর সাথেও ভিডিও কলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা সম্ভব হচ্ছে। বিপদের মুহূর্তে সাহায্য চাইতেও প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

মাধ্যম পাল্টালেও বন্ধুত্বের মূল চেতনা অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করতে পারা এবং নিঃশর্ত পাশে থাকার নামই বন্ধুত্ব। স্ক্রিনের শত শত ফলোয়ারের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে বহু দিন যোগাযোগ না থাকা পুরোনো বন্ধুটিকে হঠাৎ ফোন করে ‘কেমন আছিস?’ জিজ্ঞেস করার সরল ডিজিটাল স্পন্দনটুকুই সম্পর্কের আসল জয়।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।