জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১১:৪ এএম

দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম একক অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে সংবেদনশীল ধাপে অবস্থান করছে। আগামী মাসেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে জোর প্রস্তুতি চলছে। এই মাইলফলক অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
Table of Contents
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে (Reactor Pressure Vessel) পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশের কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
পর্যায়ক্রমিক নিরাপত্তা ও কারিগরি কার্যক্রম যেভাবে এগচ্ছে:
পরীক্ষার অগ্রগতি: কেন্দ্র চালুর প্রথম ধাপে ২,০৪৬টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৯০টি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের চূড়ান্ত পর্যায়ের ১৮টি জটিল পরীক্ষা প্রক্রিয়াধীন।
নিয়ন্ত্রিত বিভাজন বিক্রিয়া: চলমান পরীক্ষাগুলো শেষ হলে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ফিশন বা বিভাজন বিক্রিয়া শুরু করা হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়া: বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তীব্র তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করা হবে, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে।
নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন: বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA) প্রতিটি ধাপের ফলাফল নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে অনুমোদন প্রদান করছে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (NPCBL) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান নিশ্চিত করেছেন যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কারিগরি জটিলতায় পূর্ণ। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সময়ও প্রায় ৭-৮ মাস ধরে প্রতিনিয়ত নানা পরীক্ষা চলবে। সব কার্যক্রমে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই আগামী বছর প্রথম ইউনিট থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ ক্ষমতায় বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে টানা ২৪ ঘণ্টা সমান হারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রতি দেড় বছর পর পর এতে নতুন জ্বালানি রূপান্তর করতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: জ্বালানি পরিবর্তন, বর্জ্য অপসারণ ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিটি ইউনিট বছরে সর্বোচ্চ দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।
ব্যবহৃত পারমাণবিক বর্জ্যে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তা বিদ্যমান থাকায় রাশিয়ার সঙ্গে ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী এই বর্জ্য তারা ফেরত নিয়ে যাবে। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে রাশিয়া বর্জ্য নিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষে তাদের ভূগর্ভের প্রায় ৪০০ মিটার নিচে সংরক্ষণ করবে। যেহেতু বর্জ্য অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে তা স্থানান্তর করা যায় না, তাই রূপপুরের কুলিং সেন্টারে এটি ১০ বছর পর্যন্ত নিরাপদে শীতল করা যাবে।
জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব পালন করবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টিভিএল (TVEL)। প্রথম তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ প্রকল্পের মূল চুক্তির আওতাভুক্ত। পরবর্তীতে বিশ্ববাজারের দামের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত সূত্রে জ্বালানি কেনা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে চুক্তিতে একটি উচ্চসীমা (Price Cap) নির্ধারণ করা আছে।
করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রা ডলারের সংকট এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনে জটিলতার কারণে প্রকল্পের স্বাভাবিক গতি কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
প্রকল্পের সংশোধিত মেয়াদ: মূল প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও ধাপে ধাপে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
ব্যয় সামঞ্জস্য: ঠিকাদারি চুক্তির কারণে ডলার মূল্যে প্রকল্পের খরচ না বাড়লেও, দেশীয় টাকায় ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির ফলে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬,০০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে মোট ১,৩৮,৬৮৬ কোটি টাকায়।
প্রকল্পের প্রকৌশল, সংগ্রহ ও নির্মাণ (EPC) কাজ পরিচালনা করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (Atomstroyexport)। উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি; পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (BPDB) সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে চুক্তি সম্পন্ন হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামোগত নির্মাণ খরচ বেশি হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এই বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম থাকবে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (PGB)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান জানিয়েছেন, রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে গ্রহণের জন্য সঞ্চালন অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘স্পিনিং রিজার্ভ’ (Spinning Reserve) বা তাৎক্ষণিক বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।
যদি কোনো কারিগরি কারণে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তবে গ্রিড বিপর্যয় বা ব্ল্যাকআউট এড়াতে অন্য কেন্দ্র থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ঘাটতি পূরণ করতে হয়। বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে পিডিবির স্পিনিং রিজার্ভ পরিচালনায় কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে পিডিবির মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে কম মাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ায় এই ঝুঁকিমুক্তভাবেই গ্রিড পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করার কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) সার্বিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রতিটি সূচক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট ও সম্পূর্ণ সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই কেবল শক্তি উৎপাদনে যাওয়া উচিত।
মন্তব্য