খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ২:৪৮ এএম

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প খাতে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটছে, যার ফলে শ্রমিকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম প্রধান দুটি শিল্পাঞ্চল—গাজীপুর ও সাভারের বেশ কয়েকটি বড় তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী মাসগুলোতে কারখানা বন্ধের এই ধারা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দেশের সার্বিক কর্মসংস্থানের ওপর একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
Table of Contents
পবিত্র কোরবানির ঈদের ছুটির পর থেকেই দেশের পোশাক শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা বন্ধের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সুনির্দিষ্টভাবে দুটি বড় ঘটনার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপ: এই গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে আনুমানিক ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের অভিযোগ, ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর তারা যখন কারখানায় কাজে যোগ দিতে আসেন, তখন জানতে পারেন যে তাদের চাকরি আর নেই। শ্রমিকদের দাবি, কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা নোটিশ ছাড়াই আকস্মিকভাবে তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা এই শ্রমিকেরা হঠাৎ জীবিকা হারিয়ে পরিবার নিয়ে সংকটে পড়েছেন।
গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড: গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় অবস্থিত এই কারখানাটি কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে কারখানাটির প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন শ্রমিক ও কর্মচারী একসঙ্গে চাকরি হারিয়ে সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
কারখানা বন্ধ এবং ছাঁটাইয়ের ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে, কারণ এই হাজার হাজার পরিবার সম্পূর্ণভাবে মাসিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পরও ছাঁটাইয়ের সময় তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নেয়নি।
শ্রমিকদের একটি অংশের দাবি, অভিজ্ঞ ও পুরোনো শ্রমিকদের তুলনামূলকভাবে বেশি বেতন দিতে হয়। তাই কারখানা কর্তৃপক্ষ উৎপাদন ব্যয় কমানোর একটি কৌশল হিসেবে পুরোনো ও অভিজ্ঞ শ্রমিকদের বাদ দিয়ে নতুন কর্মী নিয়োগের পথ বেছে নিচ্ছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য আইনগত সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হচ্ছে না। তাদের মতে, ব্যবসায়িক মন্দাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে শ্রমিক ছাঁটাই করছে।
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পোশাক শিল্পে চলমান এই সংকটের পেছনে মূলত চারটি প্রধান কারণ কাজ করছে:
১. আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস: বিশ্ববাজারে, বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে পোশাকের ভোক্তা চাহিদা আগের চেয়ে কমে গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ পাওয়ার প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আয়ের ওপর।
২. উৎপাদন ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি: অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার উৎপাদন ব্যয়কে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বহুমুখী আর্থিক চাপ অনেক কারখানার পক্ষে সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।
3. শ্রম ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি: শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কার্যকর করার কারণে কারখানার শ্রম ব্যয় (Labor Cost) বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এটি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার জন্য ইতিবাচক, তবে কারখানার উৎপাদনশীলতা (Productivity) সমহারে না বাড়ায় দুর্বল ও ছোট কারখানাগুলো এই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সহ্য করতে পারছে না।
৪. আর্থিক লোকসান ও ঋণগ্রস্ততা: দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলতে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সংকুচিত করছে অথবা কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র (BGMEA) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান তথ্য দিয়েছিলেন যে, বিগত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর বাইরেও আরও বহু কারখানা বর্তমানে গুরুতর আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক কারখানা এখন তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা (Production Capacity) ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে পারছে না। উৎপাদন কমে গেলেও কারখানাগুলোর স্থায়ী ব্যয়—যেমন ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, ভবনের ভাড়া এবং প্রশাসনিক খরচ অপরিবর্তিত থাকছে। ফলে নিয়মিত এই স্থায়ী ব্যয় বহন করতে গিয়ে ছোট ও মাঝারি আকারের পোশাক কারখানাগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্রমাগত হেরে যাচ্ছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো তীব্র আর্থিক সংকট। তিনি উল্লেখ করেন যে, রুগ্ন ও বন্ধপ্রায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ সহায়তা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে এই তহবিলটি এখনও মাঠপর্যায়ে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের স্তরে পৌঁছায়নি। ফলস্বরূপ, চরম সংকটে থাকা কারখানাগুলো এখনও কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ আর্থিক সুবিধা বা প্রণোদনা পাচ্ছে না।
তার পরামর্শ অনুযায়ী, যেসব কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত করে বিশেষ সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। পোশাক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা। এর জন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদান, ব্যাংকঋণে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। অন্যথায় কারখানা বন্ধের এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা পোশাক শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হবে।
(সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)
মন্তব্য