জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৫০ এএম

বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্র রয়েছেন, যাঁরা প্রথাগত প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকলেও তাঁদের সৃষ্টি ও সুরের মায়ায় আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয় দোলা দেয়। কালজয়ী গান ‘পুরাতন মনটাতে আর সয়না কোনো নতুন জ্বালাতন’-এর সুধা ঢেলে যিনি বাংলা গানের ভাণ্ডারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন—বিখ্যাত শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার আনোয়ার উদ্দিন খান।
Table of Contents
১৯৩৫ সালের ৪ জুন রাজবাড়ী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এই মহান সঙ্গীতসাধক। তাঁর পিতা ছিলেন আকবর আলী খান। শৈশব থেকেই আনোয়ার উদ্দিন খানের মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থায় অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে ১৯৫২ সালে তিনি মুসলিম হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করেন। পরবর্তীকালে শিক্ষা অনুরাগী এই তরুণ দেশের সর্ব্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৬১ সালে তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেন ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে। তবে জীবনের মূল উপজীব্য এবং আত্মিক সংযোগ ছিল সঙ্গীতের সুরের জগতে। চাকরি জীবনের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থেকেও তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সময়ের সাথে সাথে নিজস্ব শৈলী ও গায়কি দিয়ে নিজেকে একজন স্বতন্ত্র ও মৌলিক সঙ্গীতস্রষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
আনোয়ার উদ্দিন খান ছিলেন একাধারে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার এবং গীতিকার। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বেসিক ডিস্ক কিংবা বাংলা চলচ্চিত্র—সব মাধ্যমেই তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য পদচারণা ছিল। কবি ও বিখ্যাত গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামালের সাথে তাঁর সৃজনশীল যুগলবন্দি বাংলা গানে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
চলচ্চিত্রে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ‘অপরাজিতা’ ছবির মাধ্যমে। কেবল গান গেয়েই ক্ষান্ত হননি, চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও তিনি সফলতার পরিচয় দেন। তাঁর অসাধারণ সুরারোপিত চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম হলো ‘বাল্যবন্ধু’ এবং ‘মায়ার সংসার’। এছাড়া শ্রোতানন্দিত ‘ময়নামতি’ চলচ্চিত্রেও তিনি নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে গান গেয়েছেন।
তাঁর কন্ঠে গাওয়া এবং সুর করা অসংখ্য কালজয়ী গানের মধ্যে কয়েকটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য গান হলো:
‘পুরাতন মনটাতে আর সয়না কোনো নতুন জ্বালাতন’
‘লোকে বলে প্রেম’
‘কচি পাতার টিয়া রঙ’
‘জড়োয়া অলংকারে’
ব্যক্তিজীবনে তিনি সুলতানা আরা বেগম (লিলি)-র সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির একমাত্র কন্যাসন্তান আরজিনা খান টুম্পা। সঙ্গীতের মাধ্যমে দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে অসামান্য ও অবিনাশী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৫ সালে মরণোত্তর সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।
২০০২ সালের ২ আগস্ট এই মহান সুরসাধক ও নিভৃতচারী শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি বাংলা গানের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। প্রচারের আলো থেকে আড়ালে থাকলেও তাঁর সৃষ্টি, সুর এবং অবিনাশী কণ্ঠস্বর বাংলা গানের আকাশে চিরদিন অনির্বাণ শিখার মতো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে।
মন্তব্য