খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ৩:১৭ পিএম

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে টিকে থাকার মিশনে আজ মাঠে নামছে বাংলাদেশ। হারারে স্পোর্টস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দ্বিতীয় ওয়ানডে সফরকারী দলের জন্য কার্যত ‘করো কিংবা মরো’ ম্যাচ। প্রথম ওয়ানডেতে অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর সিরিজে সমতা ফেরানোর একমাত্র উপায় জয়। হারলে সিরিজ হাতছাড়া হবে, আর জিতলে শেষ ম্যাচে শিরোপা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টায় শুরু হওয়া এই ম্যাচকে ঘিরে তাই বাড়তি চাপের পাশাপাশি প্রত্যাশাও রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়ানডে ক্রিকেটে যে ধারাবাহিকতা তৈরি করেছিল বাংলাদেশ, সেটি ধরে রাখার জন্যও এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেক বেশি।
এক সময় টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজে হেরে কঠিন সময় পার করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের শুরুর সেই ব্যর্থতার ধারা দলের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। তবে বছরের শেষ দিকে ঘুরে দাঁড়ায় টাইগাররা। নিজেদের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর পর পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও সিরিজ জিতে নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় দল। সেই সাফল্যের ফলে সরাসরি ওয়ানডে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়েও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে বাংলাদেশ।
কিন্তু হারারের প্রথম ওয়ানডেতে সেই ছন্দে বড় ধাক্কা লাগে। ম্যাচের শুরুতে সবকিছু বাংলাদেশের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলেও শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং ব্যর্থতায় জয় হাতছাড়া হয়। ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল পেসার নাহিদ রানার দুর্দান্ত বোলিং। মাত্র ২১ রান খরচ করে ৬ উইকেট শিকার করে তিনি বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে এক ইনিংসে সেরা বোলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়েন। তাঁর বিধ্বংসী স্পেলের সামনে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং লাইনআপ মাত্র ১৪১ রানে গুটিয়ে যায়।
এত কম লক্ষ্য তাড়া করে জেতার কথা থাকলেও বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উপহার দেয়। ১৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে মাত্র ১১৬ রানেই অলআউট হয়ে যায় দল। ব্যাটসম্যানদের অযথা ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলা, বড় জুটি গড়ে তুলতে ব্যর্থতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করতে না পারাই পরাজয়ের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একই ধরনের ব্যাটিং দুর্বলতার কারণে সফরের একমাত্র টেস্টেও হারের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ।
তবে দলের ব্যাটিং নিয়ে এখনই হতাশ নন জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ব্যাটসম্যানরা যেভাবে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করেছে, সেই সামর্থ্য তাদের রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, বাকি দুই ওয়ানডে এবং পরবর্তী টি-টোয়েন্টি সিরিজে ব্যাটাররা নিজেদের সেরা ছন্দে ফিরতে পারবেন।
আশরাফুলের মতে, প্রথম ম্যাচে অনেক ব্যাটসম্যান ভালো শট খেললেও সেগুলো সরাসরি ফিল্ডারের হাতে চলে গেছে। তিনি মনে করেন, হারারের বড় বাউন্ডারি এবং বাড়তি বাউন্সের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। দেশের মাঠে যেখানে সাধারণত ৬০ থেকে ৬৫ মিটার বাউন্ডারিতে খেলার অভ্যাস, সেখানে হারারের বাউন্ডারি প্রায় ৭৩ থেকে ৭৫ মিটার। ফলে বাংলাদেশে যেসব শট সহজেই ছক্কা বা চার হয়ে যায়, সেগুলো এখানে সহজেই ক্যাচে পরিণত হতে পারে। এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যাটসম্যানদের আরও ধৈর্যশীল ও পরিস্থিতি-ভিত্তিক ক্রিকেট খেলতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের আরেকটি কারণ সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও। ২০২২ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজেও ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল টাইগাররা। এবারও প্রথম ম্যাচে পরাজয়ের পর সেই স্মৃতি আবার সামনে চলে এসেছে। ফলে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জয় শুধু সিরিজ বাঁচানোর জন্য নয়, মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এর মধ্যেই দলে এসেছে নতুন ধাক্কা। উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান লিটন দাস পুরোপুরি চোটমুক্ত হতে না পারায় পুরো ওয়ানডে সিরিজ থেকেই ছিটকে গেছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ ওয়ানডেতে চোট পাওয়ার পর তিনি টি-টোয়েন্টি সিরিজ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টেও খেলতে পারেননি। ওয়ানডে সিরিজের জন্য সফরে গেলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক দলের পরামর্শে তাঁকে বিশ্রামে রাখা হয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে ব্যাটিং বিভাগে অভিজ্ঞতার ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে প্রথম ম্যাচের জয় জিম্বাবুয়েকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। নিজেদের কন্ডিশনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা আজ সিরিজ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে। স্বাগতিকদের জন্য এটি ইতিহাস গড়ার সুযোগ, আর বাংলাদেশের জন্য নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের মঞ্চ।
সব মিলিয়ে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা বোলিং বিভাগ, যারা প্রথম ম্যাচে নিজেদের দায়িত্ব দারুণভাবে পালন করেছে। এখন প্রয়োজন ব্যাটিং ইউনিটের দায়িত্বশীল ও পরিণত পারফরম্যান্স। শুরুতে উইকেট না হারিয়ে ইনিংস গড়া, অযথা ঝুঁকি এড়িয়ে পরিস্থিতি বুঝে রান তোলা এবং বড় জুটি গড়ে তোলাই হতে পারে জয়ের মূল চাবিকাঠি।
হারারের এই লড়াই তাই শুধু আরেকটি ওয়ানডে নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের পরীক্ষা, সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার লড়াই এবং সিরিজে টিকে থাকার শেষ সুযোগ। আজকের ম্যাচের ফলই নির্ধারণ করে দিতে পারে সফরের বাকি অংশে বাংলাদেশের পথ কতটা কঠিন হবে।
মন্তব্য