খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই জুলাই ২০২৬, ১১:৩ পিএম

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে নবম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণের পর অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের ঘটনায় মামলা না নেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে। লিখিত এজাহার হাতে থানায় গিয়েও সুরাহা পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার। উল্টো ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নানা অজুহাতে তাদের তাড়িয়ে দিয়ে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের আশায় ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) বরোবরে লিখিত আবেদন করেছে নিপীড়িত পরিবারটি।
ভুক্তভোগী পরিবার ও লিখিত অভিযোগের নথি থেকে জানা যায়, রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়াড় ইউনিয়নের জওগাঁও গ্রামের এক মিশর-প্রবাসীর নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া কন্যা গত ১ জুলাই রাতে নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। স্বজন ও প্রতিবেশীরা চারদিকে তল্লাশি চালিয়ে বাড়ির পাশের একটি নিরিবিলি স্থান থেকে ওই কিশোরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সঙ্গে সঙ্গে রাণীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, একই এলাকার তিন কিশোর দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে ওই স্কুলছাত্রীকে মারাত্মকভাবে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। বিভিন্ন সময় কুপ্রস্তাব দেওয়া, অশালীন গালিগালাজ ও নানাভাবে হয়রানি করাই ছিল তাদের নিত্যদিনের কাজ। এ নিয়ে অভিযুক্তদের পরিবারের কাছে বারংবার নালিশ জানানো হলেও কোনো সমাধান মেলেনি। ঘটনার রাতে কিশোরীটি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাড়ির বাইরের শৌচাগারে যায়। আগে থেকেই সেখানে ওত পেতে থাকা ওই তিন কিশোর তার মুখ চেপে ধরে এবং নাকে নেশাজাতীয় দ্রব্য শুঁকিয়ে অচেতন করে তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাকে শৌচাগারের পেছনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা। জ্ঞান ফেরার পর ভুক্তভোগী কিশোরী পরিবারকে পুরো ঘটনার বিবরণ দেয়।
এই ঘটনায় কিশোরীর মা রাণী আক্তার বাদী হয়ে একই গ্রামের পাভেল (১৬), বাদল ওরফে উপাসু (১৭) এবং রিমন আলীকে (১৫) অভিযুক্ত করে রাণীশংকৈল থানায় একটি লিখিত এজাহার জমা দেন। প্রথমে মামলা নথিভুক্ত করার আশ্বাসের কথা বলা হলেও পরে থানার ওসি নানা অজুহাতে দিনের পর দিন সময়ক্ষেপণ করেন। একপর্যায়ে তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে থানায় কোনো মামলা নেওয়া হবে না, বিচার চাইলে আদালতে যেতে হবে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সুস্পষ্ট অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তথা নন্দুয়াড় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জমিরুল ইসলামের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণেই পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অভিযুক্ত তরুণেরা ওই বিএনপি নেতার ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় পুলিশ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে সাহস দেখায়নি।
কিশোরীর মা রাণী আক্তার নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তার মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছিল। থানায় লিখিত কাগজ দেওয়ার পর ওসি সাহেব প্রথমে ব্যবস্থার কথা বললেও পরে বহু দিন তাকে ঘুরিয়েছেন। মামলা না নিয়ে উল্টো স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে তারা এসপি স্যারের কাছে দরখাস্ত করেছেন। তবে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অভিযোগ দেওয়ার পর জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছিলেন।
এদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে নন্দুয়াড় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জমিরুল ইসলাম জানান, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সঙ্গে তার দূরতম কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার নাম জড়িয়েছে। তিনি পুলিশকে কোনো ধরনের প্রভাব বা সুপারিশ করেননি বলেও দাবি করেন। অন্যদিকে ঘটনায় অভিযুক্ত তিন কিশোরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালানো হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাণীশংকৈল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমানুল্লাহ আল বারী সরাসরি মন্তব্য করেন, পুরো বিষয়টি তার কাছে সাজানো ও মিথ্যা মনে হয়েছে। তাই তিনি থানায় কোনো মামলা নেননি।
তবে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত আবেদন তারা হাতে পেয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম বা অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য