খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ৩:২ পিএম

পাঁচ মাসের শিশু মো. তাকরিমকে বাঁচাতে তাঁর বাবা–মা শেষ পর্যন্ত কোনো চেষ্টাই বাকি রাখেননি। ভোলায় অসুস্থ হয়ে পড়ার পর প্রথমে তাঁকে নেওয়া হয় জেলা সদর হাসপাতালে। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসা চলে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানেও আশানুরূপ ফল না মেলায় শিশুটিকে ঢাকায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকায় তাঁর জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ)। সেই সুবিধা না থাকায় শেষ পর্যন্ত রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় এক মাসের নিরন্তর লড়াইয়ের পর গত ৬ মে হাম ও এর জটিলতায় শিশুটির মৃত্যু হয়।
তাকরিমের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় সংকটের প্রতীকও হয়ে উঠেছে। কারণ একই সময়ে এমন অসংখ্য পরিবার একই ধরনের শোকের মধ্য দিয়ে গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১০ জুলাই—মাত্র ১১৭ দিনের ব্যবধানে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে সাড়ে সাত শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বহু দশক ধরে কার্যকর টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য হিসেবে পরিচিত একটি রোগে এত বিপুল প্রাণহানি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিকে শুধু ভাইরাসের সংক্রমণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব, টিকা সরবরাহে ঘাটতি এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব। জাতীয় গণটিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা পুরোপুরি থামেনি, যা সংকটের ব্যাপকতাই তুলে ধরছে।
একসময় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। হাম নিয়ন্ত্রণে দেশের সাফল্য বিশ্বজুড়েই আলোচিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে পরিচালিত জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হয়। ২০১০ সালের ফলোআপ কর্মসূচিতেও ১ কোটি ৮১ লাখ শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালের হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনে ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয় এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাও অতিক্রম করা সম্ভব হয়। পরবর্তী কয়েক বছরেও টিকাদানের হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি ছিল।
কিন্তু সেই ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ছেদ পড়ে ২০২৫ সালে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর হাম টিকাদানের কভারেজ নেমে আসে মাত্র ৫৯ শতাংশে। একই সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিকার সংকটের খবরও সামনে আসে। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই নিম্ন কভারেজই চলতি বছরের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফও আগেভাগেই সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে সতর্ক করেছিল। সংস্থাটির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানান, টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পর সম্ভাব্য সরবরাহ বিলম্ব ও সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে একাধিকবার সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল। বৈঠক, আনুষ্ঠানিক চিঠি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় একই উদ্বেগ তুলে ধরা হলেও তা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সও জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অন্তত পাঁচটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয় এবং প্রায় ১০টি বৈঠকে সম্ভাব্য টিকা সংকট নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে নির্ধারিত সময়ে দেশে ভ্যাকসিন পৌঁছাতে দেরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে সেই বিলম্বের প্রভাব সংক্রমণ বৃদ্ধির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। পরে জাতীয় এমআর টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হলেও সব শিশু টিকার আওতায় আসেনি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশুকে এমআর টিকা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে একই বয়সী শিশুদের জন্য পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়েছে ২ কোটি ২৩ লাখেরও বেশি শিশু। অর্থাৎ অন্তত ৪০ লাখ শিশু হাম প্রতিরোধী টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল ব্যবধান ভবিষ্যতেও সংক্রমণের ঝুঁকি বহাল রাখতে পারে।
গত দুই দশকের পরিসংখ্যানও বর্তমান পরিস্থিতির ব্যতিক্রমী চিত্র তুলে ধরে। ২০০৫ সালে দেশে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে রোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। ২০২০ সালে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪১০। ২০২১ সালে তা নেমে আসে ২০৩-এ। ২০২২ সালে ছিল ৩১১, ২০২৩ সালে ২৮১ এবং ২০২৪ সালে ২৪৭ জন। এমনকি ২০২৫ সালে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩২। ওই সময় উল্লেখযোগ্য মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসেনি। সেই প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বর্তমান প্রাদুর্ভাবের হিসাবের সময় | ১৫ মার্চ–১০ জুলাই (১১৭ দিন) |
| এই সময়ে শিশুমৃত্যু | সাড়ে ৭ শতাধিক |
| ২০০৬ সালের হাম টিকাদান লক্ষ্য | ৩ কোটি ৪২ লাখ শিশু |
| ২০১০ সালের ফলোআপ কর্মসূচি | ১ কোটি ৮১ লাখ শিশু |
| ২০১৪ সালের হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন | ৫ কোটি ২৭ লাখ শিশু |
| ২০২৫ সালের হাম টিকাদান কভারেজ | ৫৯ শতাংশ |
| এমআর টিকা প্রাপ্ত শিশু | ১,৮৪,৭৭,৬১৬ |
| ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণকারী শিশু | ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি |
| টিকার বাইরে থাকা শিশুর আনুমানিক সংখ্যা | অন্তত ৪০ লাখ |
| ২০০৫ সালে হাম রোগী | ২৫,৯৩৪ জন |
| ২০২০ সালে হাম রোগী | ২,৪১০ জন |
| ২০২১ সালে হাম রোগী | ২০৩ জন |
| ২০২২ সালে হাম রোগী | ৩১১ জন |
| ২০২৩ সালে হাম রোগী | ২৮১ জন |
| ২০২৪ সালে হাম রোগী | ২৪৭ জন |
| ২০২৫ সালে হাম রোগী | ১৩২ জন |
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি হলেও এর বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে নিরাপদ ও কার্যকর টিকা ব্যবহৃত হচ্ছে। পর্যাপ্ত টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে হামজনিত অধিকাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার উল্লেখ করেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়বে না; এটি পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণ, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাস্তবায়নের কার্যকারিতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে।
এই পরিস্থিতিতে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন টিকাদানের হার এত দ্রুত কমে গেল? টিকা সংগ্রহে বিলম্বের কারণ কী ছিল? আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আগাম সতর্কবার্তা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল? কেন লক্ষাধিক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকার আওতায় আসতে পারেনি? আর প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শত শত শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত কি না—সেই প্রশ্নও জনপরিসরে জোরালো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিয়েছে, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় শুধু সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নিলেই যথেষ্ট নয়। নিরবচ্ছিন্ন টিকা সরবরাহ, শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করা, ঝুঁকির আগাম মূল্যায়ন এবং সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এসবই ভবিষ্যতে এমন মানবিক বিপর্যয় এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একটি শিশুর জীবনও যেমন অমূল্য, তেমনি প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার বিষয় হওয়া উচিত।
মন্তব্য