জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুলাই ২০২৬, ১:৫ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুঁশিয়ারির পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। ইরানে টানা ১৩তম রাতের মতো জোরদার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে যে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত এ সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনিক সূত্রের তথ্যমতে, হামলায় খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ শহরের কাছে অন্তত ৪ জন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
Table of Contents
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ড সেন্টার, ড্রোন সংরক্ষণাগার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং নৌ-সক্ষমতা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে এ নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সম্প্রতি অঞ্চলটিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) হুমকি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সেই ঝুঁকি কমিয়ে আনা এবং ইরানকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এ দীর্ঘায়িত সামরিক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। সেন্টকম আরও দাবি করেছে, আইআরজিসির সাম্প্রতিক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের পরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ সহায়তায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদ রুট দিয়ে চলাচল করছে।
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আইআরজিসির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাবি, কৌশলগত হরমুজ প্রণালির সার্বিক নিরাপত্তা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো তেহরানের হাতেই রয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের সাথে সরাসরি সমন্বয় ও অনুমতি ছাড়া এই প্রণালি দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক বা জ্বালানিবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল সম্ভব নয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ইঙ্গিত দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে তাদের ভূখণ্ডে হামলা চালানো হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ১৩তম রাতের সমন্বিত হামলায় ইরানের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ও প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত হামলার বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
| আক্রমণাত্মক লক্ষ্যবস্তু / শহর | সংশ্লিষ্ট প্রদেশ / অঞ্চল | মূল ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ |
| আহভাজ | খুজেস্তান প্রদেশ | ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৪ জন নিহত এবং ৫ জন আহত। |
| বন্দর আব্বাস | হরমোজগান প্রদেশ | আবাসিক এলাকা ও পাহাড়ী অঞ্চলে হামলায় ২ জন আহত এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। |
| কেشم দ্বীপ | হরমোজগান প্রদেশ | সুজা ও মাসেন গ্রামের কাছে নৌ-অবকাঠামো ও ড্রোনের ঘাটিতে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। |
| আন্দিমেশক | খুজেস্তান প্রদেশ | শহরের নিকটবর্তী সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ। |
| ওমিদিয়েহ | খুজেস্তান প্রদেশ | কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। |
| ফিরুজাবাদ | ফার্স প্রদেশ | মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাধিক বিস্ফোরণ। |
| তাফ্ত | ইয়াজদ প্রদেশ | শহরের বহির্ভাগে অবস্থিত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত। |
| নাইন | ইসফাহান প্রদেশ | গভীর রাতে শহরের বাইরের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। |
| খানদাব | মারকাজি প্রদেশ | এলাকা লক্ষ্য করে মার্কিন দুটি প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ। |
| জাস্ক ও কোনারক | উপকূলীয় অঞ্চল | সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা ও ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত। |
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর ওপর হামলা চালানো হলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে। তিনি ইরানে এখন পর্যন্ত চালানো সবচেয়ে বড় ও বিধ্বংসী সামরিক হামলার বিষয়ে চিন্তা করছেন বলে ইঙ্গিত দেন। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে কুয়েতের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদের ওপর ইরানের পাল্টা হামলার পরেই ট্রাম্পের এমন কড়া বার্তা আসে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধমেঘ দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। একদিকে ওয়াশিংটনের তরফ থেকে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণের মাত্রা বাড়ানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অবস্থানে অটল থাকার ঘোষণা দিয়েছে। এ সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য