খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুন ২০২৬, ১:৩২ এএম

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে নিজের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি হারিয়ে চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপাকে পড়েছেন প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক মো. মোশারফ হোসেন (৬১)। উপার্জনের একমাত্র মাধ্যমটি চুরির পর থেকে তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মোশারফ হোসেন কুমারখালী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঠপাড়া এলাকার একজন স্থায়ী বাসিন্দা।
Table of Contents
বিগত ২ জুন উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া বড় জামে মসজিদের সামনে নিজের ভ্যানটি রেখে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে যান মোশারফ হোসেন। নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হয়ে তিনি দেখতে পান যে, তাঁর আনুমানিক ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের ভ্যানটি সেখান থেকে চুরি হয়ে গেছে। ঘটনার পর সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটির কোনো সন্ধান মেলেনি। পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে ৩ জুন কুমারখালী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।
শনিবার সকালে কুমারখালী থানা চত্বরে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোশারফ হোসেন জানান:
“নামাজ পড়ে এসে দেখি ভ্যানডা নাই। চারদিন ধরে চেয়ারম্যান, নেতা, থানা, পুলিশ ঘুরতেছি, কোনো লাভ হচ্ছে না। ভ্যানটুকুর ওপরই সংসার চলত। বাড়িতে চালডা আছে, তরকারি নাই। এহন পান্তা খাচ্ছি। আমি অসুস্থ, বউডা অসুস্থ, বৃদ্ধ মা অসুস্থ। একদিন পরপর ১২০ টাহার ওষুধ লাগে। টেনশনে দেহমেহ শুকো যাচ্ছে।”
জানা গেছে, তিন বছর আগে ঘটে যাওয়া এক সড়ক দুর্ঘটনায় মোশারফ হোসেনের বাঁ পা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলাফেরা করেন। এই শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভ্যান চালানো ছাড়া অন্য কোনো কঠিন পরিশ্রমের কাজ করা তাঁর পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে তিনি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করতেন এবং তা দিয়েই তাঁর চার সদস্যের সংসার চলত।
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, খয়েরচারা বাজার-ফুলতলা সড়কের পাশে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য পরিবেশে বসবাস করেন মোশারফ। সেই ঘরে তাঁর সঙ্গে তাঁর অসুস্থ বৃদ্ধা মা নবিরন নেছা, স্ত্রী আলেয়া খাতুন ও একজন বেকার ছেলে বসবাস করছেন। টাকার অভাবে বর্তমানে তিনি নিজের জন্য ওষুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন এবং একটি ভ্যানের জন্য আকুতি জানাচ্ছেন যাতে পুনরায় কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারেন।
বৃদ্ধা মা নবিরন নেছা: তাঁর ছেলে নামাজ পড়তে বসার পর এসে দেখে ভ্যানটি নেই। চুরির পর থেকে কেঁদে কেঁদে দিন পার করছে সে। দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ভ্যান চালানো ছাড়া সে আর কিছুই করতে পারে না। একটি ভ্যানের ব্যবস্থা হলে পরিবারটি আবার সচল হতে পারবে।
স্ত্রী আলেয়া খাতুন: তিনি নিজে ইতিপূর্বে দুইবার স্ট্রোক করেছেন এবং তাঁর শাশুড়ির মাজা ভাঙা। গত কয়েকদিন ধরে টাকার অভাবে তাঁরা কোনো ওষুধ ও বাজার কিনতে পারছেন না। পুরো পরিবারটি ওই ভ্যানের আয়ের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে ঘরে থাকা চাল নুন-পানি দিয়ে খেতে হচ্ছে তাঁদের। তিনি সকলের নিকট একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।
প্রতিবেশী মো. পান্না বলেন, ভ্যান হারিয়ে মোশারফ হোসেনের পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এবং তাদের নতুন ভ্যান কেনার কোনো আর্থিক সামর্থ্য নেই। সরকার বা কোনো সংস্থা যদি একটি ভ্যানের ব্যবস্থা করে দেয়, তবে পরিবারটি খেয়েপরে বাঁচতে পারবে।
জোতমোড়া বড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য রবিউল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মাগরিবের নামাজের সময়ই চুরির ঘটনাটি ঘটেছিল। মসজিদের সিসিটিভি ফুটেজে চুরির দৃশ্যটি ধারণ করা থাকলেও চোরের মুখ স্পষ্ট না থাকায় তাকে চেনা যাচ্ছে না। তবে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করার आश्वासन বা আশ্বাস দেন তিনি।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন এই বিষয়ে জানান, থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগটি পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, ভ্যানচালকের বিষয়ে সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে। একই সাথে তিনি সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক ব্যক্তিদেরও এই অসহায় পরিবারের পাশে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান।
মন্তব্য