ভারত থেকে বাংলাদেশের ভেতরে মানুষকে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) অভিযোগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান পুনরায় স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ এ ধরনের কার্যক্রমকে অবৈধ, মানবাধিকারবিরোধী এবং আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ভারত বলেছে, তাদের নিজস্ব আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। চার দিনের এই সম্মেলনে সীমান্ত পরিস্থিতি, পুশ ইন, সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন, চোরাচালান, মানব পাচার এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় আলোচ্যসূচিতে ছিল।
বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। সূচি অনুযায়ী, বৈঠকের পরবর্তী ধাপে দুই পক্ষ সম্মত কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা করবে এবং আগামী দিনে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে। এদের মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। এছাড়া ভারতীয় পক্ষের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ২ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি মানুষকে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে আসে। সেখানে নির্বাচনের পর অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত ও প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়। ভারতীয় পক্ষ দাবি করেছে, এই অভিযানের অংশ হিসেবে কয়েক হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পুশ ইন সংক্রান্ত তথ্য (সংক্ষিপ্ত চিত্র)
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সময়কাল | ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি |
| পুশ ইনকৃত মোট ব্যক্তি | ২,৪৭৯ জন |
| শনাক্ত ভারতীয় নাগরিক | ১২০ জন |
| ভারতীয় দাবি অনুযায়ী হস্তান্তর | ২,৮০০ জনের বেশি |
| পশ্চিমবঙ্গ থেকে ফেরত পাঠানোর দাবি | প্রায় ৪,৮৮০ জন |
বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষ জোর দিয়ে জানায়, কোনো ব্যক্তিকে সীমান্ত দিয়ে একতরফাভাবে ঠেলে পাঠানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে। বাংলাদেশ আরও জানায়, অন্য দেশ থেকে কাউকে ফেরত আনতে হলে তার নাগরিকত্ব যাচাইসহ নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। রাতের অন্ধকারে সীমান্ত দিয়ে মানুষ পাঠানোর অভিযোগ নিয়েও বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করে।
অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষ দাবি করে, অবৈধ বিদেশিদের বিষয়ে তাদের নিজস্ব আইন অনুসরণ করা হয় এবং বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তারা আরও অভিযোগ করে যে, বাংলাদেশে তালিকা পাঠানোর পর অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ ঘটে, যদিও বাংলাদেশ পক্ষ এই বক্তব্যের জবাবও বৈঠকে উপস্থাপন করেছে।
বৈঠকের আলোচনায় সীমান্তে মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য অবৈধ পণ্যের চোরাচালান প্রতিরোধ, মানব পাচার বন্ধ, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন রোধ এবং সীমান্ত অবকাঠামো সংক্রান্ত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সংশ্লিষ্ট একটি সংবাদ সম্মেলনে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মন্তব্য করেন, দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন, এবং দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।