হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং এই আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর ‘পরিচালন ফি’ বা টোল আরোপের বিষয়ে ইরানের একক ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। ইরান এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে দাবি করার পর মাসকাট বর্তমানে এক কঠিন কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। ওমান দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত হলেও ইরানের এই সাম্প্রতিক দাবি দেশটিকে পশ্চিমা বিশ্ব ও আরব প্রতিবেশীদের সামনে বিব্রতকর অবস্থানে ফেলেছে।
ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ। ওমানের মুসান্দাম ছিটমহল এবং ইরানের উপকূলের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে বিশ্বের মোট সামুদ্রিক জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ (এক-পঞ্চমাংশ) পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান এই জলপথটি অবরুদ্ধ করে রাখে। দীর্ঘ ১০ সপ্তাহ ধরে এই অবরোধ চলার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি ভারতে এক বক্তব্যে দাবি করেন যে, হরমুজ প্রণালিতে কোনো আন্তর্জাতিক জলসীমা নেই। এটি সম্পূর্ণভাবে ইরান ও ওমানের সার্বভৌম জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। আরাগচির মতে, প্রণালিটির ভবিষ্যৎ পরিচালনার জন্য দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করছে। তবে ওমান সরকার এখন পর্যন্ত ইরানের এই দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। বিশেষ করে ফি আদায় এবং জাহাজের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে মাসকাট রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে।
বিতর্কিত ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (পিজিএসএ)
ইরান গত ৫ মে ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি (পিজিএসএ)’ নামে একটি সংস্থা গঠন করেছে। এই সংস্থার মাধ্যমে তারা প্রণালি পার হওয়া জাহাজগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, জাহাজগুলোকে ই-মেইলের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে এবং প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য প্রায় এক ডলার সমপরিমাণ ফি প্রদান করতে হবে। এই ফি পরিশোধ করতে হবে ইরানি মুদ্রা ‘রিয়ালে’, যা মূলত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে প্রস্তাবিত পরিবর্তনসমূহ:
| বিষয় | ইরানের প্রস্তাবিত নিয়ম | বর্তমান আন্তর্জাতিক অবস্থান |
| জলসীমার মর্যাদা | সম্পূর্ণ আঞ্চলিক জলসীমা (ইরান ও ওমান) | আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত জলপথ |
| ফি বা টোল | প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য ১ ডলার (প্রায়) | কোনো ফি প্রযোজ্য নয় (ফ্রি প্যাসেজ) |
| মুদ্রা | ইরানি রিয়াল (আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট একাউন্ট) | আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা |
| নিবন্ধন | পিজিএসএ-র কাছে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন | আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার (IMO) নিয়ম অনুসরণ |
| কর্তৃত্ব | ইরান ও ওমানের যৌথ নিয়ন্ত্রণ | আন্তর্জাতিক আইন ও আনক্লস (UNCLOS) |
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি জটিলতা
পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইনবিষয়ক সনদ (UNCLOS) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালিতে ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা অবাধ যাতায়াতের অধিকার স্বীকৃত। ইরান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও তা কখনো অনুমোদন (Ratify) করেনি। তেহরানের দাবি, তারা প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সার্বভৌমত্বের হুমকিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ইরানকে টোল দেওয়ার মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স ইতিমধ্যে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখতে একটি পাল্টা পরিকল্পনা ওমানের কাছে পেশ করেছে, যা অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশ সমর্থন করছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনৈতিক পরিচালক লর্ড লুয়েলিন এবং আইএমও মহাসচিব আর্সেনিও ডমিনগুয়েজ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সম্প্রতি মাসকাট সফর করেছেন।
এদিকে চীনের অবস্থান এই সংকটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের আমদানিকৃত ইরানি তেলের ৪৫ শতাংশ এই পথ দিয়ে আসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে চীনও টোল আদায়ের বিপক্ষে, তবে চীন সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যেই আইআরজিসি জানিয়েছে যে, কিছু চীনা ট্যাংকার ইরানের নিয়ম মেনে চলায় তাদের চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যদিও তারা ফি দিয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সার্বিকভাবে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান এখন ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
