জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ১০:২২ পিএম

বিশ্বজুড়ে দুরারোগ্য ক্যানসার নিরাময়ের গবেষণায় এক ঐতিহাসিক অর্জনের কথা জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটিতে প্রথমবার উদ্ভাবিত এমআরএনএ (mRNA) প্রযুক্তির ক্যানসার টিকার প্রায়োগিক পরীক্ষায় অত্যন্ত চমকপ্রদ ও ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের মতে, চিকিৎসাধীন প্রথম রোগীর দেহে ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো সুনির্দিষ্ট রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা (Immune Response) গড়ে উঠেছে। বর্তমানে ওই রোগী শারীরিকভাবে স্থিতিশীল ও সুস্থ রয়েছেন।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের নেতৃত্ব দেওয়া রাশিয়ার বিখ্যাত ‘গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি’-র বৈজ্ঞানিক পরিচালক আলেক্সান্দর গিনজবার্গ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘আরটি’ (RT)-কে দেওয়া সাক্ষাত্কারে তিনি জানান, পরীক্ষামূলক টিকাটি রোগীর শরীরে প্রবেশের পরপরই তাঁর ইমিউন সিস্টেম ক্যানসার কোষগুলোকে চিনে নিয়ে আক্রমণ করতে শুরু করেছে। ফলে টিউমারের বৃদ্ধি থমকে যাওয়ার পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য সংবেদনশীল অঙ্গে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া (Metastasis) রোধে কার্যকর প্রতিরক্ষা তৈরি হচ্ছে।
গত বছর রাশিয়ান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী দুটি দেশীয় উদ্ভাবনের চূড়ান্ত প্রশাসনিক ও ক্লিনিক্যাল অনুমোদন প্রদান করে। এর মধ্যে একটি হলো মারাত্মক ত্বকের ক্যানসার বা মেলানোমা দমনে বিশেষ এমআরএনএ টিকা ‘নিওঅনকোভ্যাক’ (NeoOncoVac)। অন্যটি কলোরেক্টাল বা কোলন ক্যানসারের নিরাময়ে উদ্ভাবিত বিশেষ পেপটাইড থেরাপি ‘অনকোপেপ্ট’ (Oncopept)।
প্রাক-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ধারাবাহিকতায় এপ্রিলে ৬০ বছর বয়সী এক ক্যানসার রোগীর শরীরে প্রথমবারের মতো ‘নিওঅনকোভ্যাক’ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তৃতীয় পর্যায়ের জটিল মেলানোমায় আক্রান্ত ওই ব্যক্তি বর্তমানে দেশটির শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্র ‘মস্কো হারজেন অনকোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে’ নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন আছেন। ড. গিনজবার্গ নিশ্চিত করেন যে, নির্ধারিত মেডিকেল প্রোটোকল অনুযায়ী রোগীকে আরও দুটি পূর্ণাঙ্গ বুস্টার ডোজ প্রদান করা হবে এবং পরবর্তী কিছুদিন তাঁর শরীরের অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নিওঅনকোভ্যাক প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো এটি প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুত করা হয় (Personalized Medicine)। এই প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে রাশিয়ার ন্যাশনাল মেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার অব রেডিওলজির প্রধান আন্দ্রে কাপরিন জানান, ক্যানসার রোগীর শরীর থেকে সংগৃহীত টিউমারের নিজস্ব জিনগত মানচিত্র (Genetic Profile) বিশ্লেষণ করেই প্রতিটি ভ্যাকসিন আলাদাভাবে ডিজাইন করা হয়। ফলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা শ্বেত রক্তকণিকা সরাসরি ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলোকে চিহ্নিত করে নির্মূল করতে শেখে, যা প্রচলিত কেমোথেরাপির মতো সুস্থ কোষের ক্ষতি করে না।
প্রাথমিক এই সাফল্যের পর গবেষকেরা থেমে নেই। ইতিমধ্যেই আরও ১০ জন জটিল ক্যানসার রোগীর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে তাঁদের জন্য স্বতন্ত্র ভ্যাকসিন তৈরির কাজ পুরোদমে এগোচ্ছে। আগামী দেড় থেকে তিন মাসের মধ্যেই এই ওষুধ প্রস্তুত হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে কলোরেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘অনকোপেপ্ট’ থেরাপিতেও আশাব্যঞ্জক রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন রাশিয়ান চিকিৎসকেরা। মেলানোমা ও কলোরেক্টাল ক্যানসারের এই সাফল্য বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে। রুশ বিজ্ঞানীরা এখন এই একই এমআরএনএ ও পেপটাইড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অগ্ন্যাশয় (Pancreatic), কিডনি এবং ফুসফুসের নন-স্মল সেল ক্যানসারের মতো কঠিন মরণব্যাধিগুলোর জন্য কার্যকর প্রতিষেধক তৈরির গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন।
মন্তব্য