জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৩১ পিএম

ভারতের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্ম এবং তাদের প্রতিবাদ বরাবরই এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে এসেছে। সম্প্রতি দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ভিডিও বার্তাকে কেন্দ্র করে দিল্লির মসনদ থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। আন্দোলনে যুক্ত থাকা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত সহনশীলতা ও ক্ষমার বার্তা দিলেও, সেই ক্ষমার প্রকৃত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ধারাবাহিক ভিডিও বার্তার পঞ্চম পর্বটি প্রকাশ করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময় কিছু ক্ষুব্ধ তরুণ তাঁর বিরুদ্ধে অত্যন্ত অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছে, এমনকি তাঁর প্রয়াত মাকেও কুৎসিত আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। তবে দেশের অভিভাবকতুল্য অবস্থান থেকে তিনি এই ভুলগুলোকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে চান। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, গালিগালাজ বা অপমান কোনো দিনই সমাধানের পথ হতে পারে না। ঠিক একইভাবে মামলা, পুলিশি হয়রানি বা শাস্তির মাধ্যমেও তরুণ সমাজকে সঠিক পথে রাখা সম্ভব নয়। ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত তরুণদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এবং তাঁদের ইতিবাচক কাজে যুক্ত করাই সরকারের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ভিডিওটির মন্তব্য স্থানে নিজের তীব্র মতামত প্রকাশ করেন অভিজিৎ দীপকে। তিনি মোদির বার্তার পেছনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে জানতে চান—এই ক্ষমা কি শুধুই সংবাদ শিরোনাম হওয়ার মতো মুখরোচক কথা, নাকি আন্দোলনের কারণে যেসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ ও মামলা করা হয়েছে, সেগুলো সত্যিই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হবে? অভিজিতের এই প্রশ্ন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এই বিতর্কের শেকড় কিন্তু বেশ গভীর। রাজধানী নয়াদিল্লির বিখ্যাত যন্তর মন্তরে সম্প্রতি প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা দুর্নীতির অভিযোগে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আন্দোলনে নামেন। বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে নয়ডার এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে মামলা দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ক্ষোভ আরও দ্বিগুণ হয়। আন্দোলন দ্রুত পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিরোধী দলগুলো আন্দোলনের সমর্থনে সরব হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির চাপে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মন্ত্রীর পদত্যাগের পরও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার জট খোলেনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে তরুণদের ক্ষোভ এবং বেকারত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তি কাটাতে প্রধানমন্ত্রী এই সরাসরি যোগাযোগের পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি দেখাতে চাইছেন যে সরকার দমনপীড়নে বিশ্বাসী নয়, বরং আলোচনার টেবিলে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বার্তা দিয়ে সংকট মেটাতে আগ্রহী।
তবে বিরোধী দলগুলো এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষমার বার্তা কেবল সুন্দর কথা ও সহানুভূতিশীল বক্তব্যে আটকে থাকলে চলবে না। যদি প্রধানমন্ত্রী সত্যিই তরুণদের ক্ষমা করে দিতে চান, তবে আইন মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে আন্দোলনকারীদের ওপর থেকে সব ধরনের ফৌজদারি ও আইনি মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিতে হবে। সরকার এখন পর্যন্ত মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি বা ঘোষণা না দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। ফলে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই সাময়িক স্বস্তি বাস্তবে কতটুকু রূপ নেয়, আর মামলাগুলো আসলেই খারিজ হয় কি না—সেদিকেই এখন নজর পুরো ভারতের।
মন্তব্য