নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের অন্যতম উজ্জ্বল, সাহসী ও দূরদর্শী ছাত্রনেতা ছিলেন শফি আহমেদ। রাজপথের আপসহীন আন্দোলন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশের সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তিনি সর্বদলীয় ছাত্রসমাজের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সহযোদ্ধা তাঁকে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক বলে আখ্যায়িত করেন। আন্দোলনের নানামুখী কৌশল নির্ধারণ, নীতিগত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং মাঠপর্যায়ের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তাঁর অনবদ্য ভূমিকা ছিল। গণআন্দোলনের এক বেদনাবিধুর মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যখন ছাত্রনেতা রাউফুন বসুনিয়া সামরিক স্বৈরাচারের মদদপুষ্টদের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন, তখন মিছিলের ভেতরে তাঁর হাত ধরে ছিলেন এই শফি আহমেদ। ইতিহাসের পাতায় সেই মর্মস্পর্শী দৃশ্যটি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের এক অমোঘ সাক্ষ্য হয়ে টিকে আছে।
জন্ম, পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও শিক্ষাজীবন
শফি আহমেদ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেত্রকোনা জেলার মুক্তারপাড়ায় ১৯৬১ সালের ৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সমাজসেবক মরহুম এডভোকেট এটিএম আজিজুল হক। এক ভাই ও ছয় বোনের সুবৃহৎ পরিবারে বেড়ে ওঠা শফি আহমেদের শৈশব ও কৈশোরকাল অতিবাহিত হয়েছে নেত্রকোনার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সামাজিক পরিমণ্ডলে। নিচে সারণির মাধ্যমে তাঁর শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপসমূহ উপস্থাপন করা হলো:
| শিক্ষাগত স্তর | শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম | অর্জিত সাফল্য ও বিবরণ |
| মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট | নেত্রকোণা আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় | সফলতার সাথে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। |
| উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট | নেত্রকোণা সরকারি কলেজ | উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সাফল্যের সাথে সমাপ্ত করেন। |
| স্নাতক (সম্মান) | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | আইন বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। |
| স্নাতকোত্তর | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | আইন শাস্ত্রে উচ্চতর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। |
সাংগঠনিক জীবনের সূচনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘নেত্রকোণা মধুমাছি কচি-কাঁচার মেলা’র মাধ্যমে শৈশবেই শফি আহমেদের সাংগঠনিক জীবনের শুভ সূচনা ঘটেছিল। অতি অল্প বয়সেই তিনি অনন্য নেতৃত্ব গুণাবলী, প্রখর সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করে তিনি তৎকালীন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে ছাত্ররাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করে।
১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গঠিত ঐতিহাসিক ‘জনতার আদালত’ বা গণআদালতের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি শুরু থেকেই প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধার ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রতিটি সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক বজ্রকণ্ঠ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত আন্তরিক, নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাঁর প্রখর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অসাধারণ কর্মদক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতার কারণে তিনি সমকালীন জাতীয় রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা, নীতিনির্ধারণী আলোচনা ও ক্রান্তিকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং অংশীদার হওয়ার সুযোগ লাভ করেছিলেন।
পারিবারিক জীবন ও তিরোধান
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে শফি আহমেদ ছিলেন একজন অত্যন্ত স্নেহশীল স্বামী ও দায়িত্বশীল পিতা। তাঁর সহধর্মিণী তাহেরা খোন্দকার। বৈবাহিক জীবনে তিনি দুই পুত্র সন্তানের জনক, যাঁদের নাম আফসিন আহমেদ ও আলদিন আহমেদ। ২০২৪ সালের ৩ জুন সন্ধ্যায় এই লড়াকু জননেতা মৃত্যুবরণ করেন। আজ ২০২৬ সালের ৩ জুন তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী পূর্ণ হলো। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শফি আহমেদ ক্ষমতার লোভ লালসার ঊর্ধ্বে থেকে আদর্শিক রাজনীতি বজায় রেখেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন, দেশের গণতন্ত্রের প্রতি অবিচল ও আপসহীন অঙ্গীকার, সহযোদ্ধাদের প্রতি গভীর আন্তরিকতা এবং রাজপথের অকুতোভয় ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
