জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৩১ পিএম

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এতদিন বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী ও করপোরেট গ্রাহকদের ঋণখেলাপি হওয়া নিয়ে জোর আলোচনা থাকলেও, এবার নতুন সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে ক্ষুদ্র ও খুচরা ঋণগ্রহীতাদের খেলাপির বড় উল্লম্ফন। কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই), কৃষি, আবাসন এবং ব্যক্তিগত ঋণ খাতে খেলাপি হওয়ার এই উদ্বেগজনক প্রবণতা ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়, যার মধ্যে সার্বিক খেলাপির হার পৌঁছেছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এক কোটি টাকার কম ঋণ রয়েছে—এমন খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা গত বছরের মার্চের ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩ জন থেকে একলাফে বেড়ে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খুচরা পর্যায়ের এই শ্রেণিতে খেলাপি গ্রাহক বেড়েছে প্রায় ২৩ লাখ ৮০ হাজার বা সাড়ে ২৩ লাখের বেশি।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ এ প্রসঙ্গে জানান, জীবনযাত্রার ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ ব্যবসার পরিচালনা খরচ বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ চাকরিজীবীদের আসল আয় কমে গেছে। ফলে জীবনযাত্রার টানাপোড়েনে পড়ে তাদের কিস্তি পরিশোধের আর্থিক সক্ষমতা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে বিভিন্ন ঋণের শ্রেণিতে খেলাপির হার এবং গ্রাহকসংখ্যার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে:
১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ: মোট ঋণের স্থিতি প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যার ১৫ শতাংশ খেলাপি। খেলাপির হার তুলনামূলক কম হলেও গ্রাহক বিচারে এই সংখ্যা ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ছাড়িয়েছে।
১ থেকে ১০ কোটি টাকা ঋণ: এই ঋণের মোট স্থিতি প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। খেলাপির হার সাড়ে ২৬ শতাংশের বেশি। খেলাপির সংখ্যা ২৫,৪৭৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮,৫০১ জনে।
১০ থেকে ২০ কোটি টাকা ঋণ: খেলাপির হার ৪৫ শতাংশ। খেলাপি গ্রাহক সংখ্যা ৩,৩৩৬ থেকে এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৬,১৮৬।
২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা ঋণ: এই শ্রেণিতে খেলাপির হার প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং গ্রাহক সংখ্যা ১,১২৫ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৫৭৪ জনে।
৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ: খেলাপির হার প্রায় ৩৯ শতাংশ, যেখানে খেলাপি গ্রাহক ৬০৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৫২।
৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা ঋণ: এখানে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশিগুলোর একটি—প্রায় ৪৫ শতাংশ। গ্রাহক সংখ্যা ৩৯২ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৬৯।
৫০ কোটি টাকার বেশি বড় ঋণ: বড় ঋণের মোট স্থিতি প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যার সাড়ে ৪২ শতাংশই এখন খেলাপির খাতায়। এই শ্রেণিতে খেলাপি গ্রাহক ১,৪৭৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ২,০৩৫ জন।
খাতওয়ারি উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, খেলাপির তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সিএমএসএমই খাত।
ব্যবসা-বাণিজ্য: ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ শতাংশই এই খাতে নিয়োজিত, যার প্রায় ৪৪ শতাংশই বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
সিএমএসএমই: এই খাতের মোট ঋণের ৩৪ শতাংশের বেশি খেলাপি। এর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা কুটির বা কটেজ শিল্পে, যেখানে খেলাপির হার প্রায় ৫৩ শতাংশ। আর মাঝারি শিল্পে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ৩৮ শতাংশে।
শিল্প ও নির্মাণ: সাধারণ শিল্প খাতে বিতরণ করা ঋণের ৩২ শতাংশ এবং নির্মাণ খাতের ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ এখন খেলাপি।
কৃষি ও অন্যান্য: কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতের ঋণে খেলাপির হার প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহক ২৪ লাখ থেকে কিছুটা কমে ২০ লাখে নেমেছে, যদিও তাদের মোট বিতরণের ৩৮ শতাংশ এখনও খেলাপি।
ভোক্তা ঋণ: ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ৯ শতাংশ দেওয়া হয়েছে আবাসন ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের ভোক্তা ঋণ হিসেবে, যার ৭ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, বড় গ্রাহকদের পাশাপাশি এখন তৃণমূলের ক্ষুদ্র ঋণগুলো খারাপের দিকে যাওয়ায় আদায় বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে তদারকি জোরদার করা হচ্ছে। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান জানান, শাখা পর্যায়ে শাখা ব্যবস্থাপকদের সরাসরি তদারকির মাধ্যমে ঋণ আদায় ও নীতিমালার আওতায় পুনঃতফসিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও তারা সহজেই সংকটে পড়েন; তাই সময়মতো সুনির্দিষ্ট নীতি-সহায়তা না দিলে ব্যাংক খাতের খুচরা পর্যায়ের এই ঝুঁকি আরও ঘনীভূত হতে পারে।
মন্তব্য