বিদ্যুতের দাম বাড়াতে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চাপ মোকাবিলায় সরকার বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা প্রস্তাবিত মূল্য সমন্বয় পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে এই প্রস্তাব পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে পাঠানো হবে, যেখানে তা যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা বিদ্যুৎ বিভাগের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় সাড়ে ৫৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এই ঘাটতি হ্রাসের উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড তিনটি বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। এসব প্রস্তাবের একটি হলো পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, যার মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

এছাড়া লাইফলাইন গ্রাহকদের বাইরে অন্যান্য আবাসিক গ্রাহকদের ওপর মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। নাগরিকদের স্বার্থ বিবেচনায় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার এই ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় ও বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে মোট বকেয়া বিলের পরিমাণ ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘ সাত থেকে আট মাস বিল পরিশোধ না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা আর্থিক সংকটে রয়েছেন। একই সঙ্গে আমদানি করা বিদ্যুতের জন্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বিলও বকেয়া রয়েছে।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক অবস্থার একটি সারসংক্ষেপ নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো—

সূচকপরিমাণ (কোটি টাকা)
মোট আয়৭০,৯২৬
মোট ব্যয়১,২৬,৫৮৫
মোট ঘাটতি৫৫,৬৫৮
প্রাপ্ত ভর্তুকি৩৮,৬৩৬
নিট ঘাটতি১৭,০২১

উল্লেখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় না করা হলে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মোট অর্থের প্রয়োজন দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা, তার মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।