খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ১২:২৩ এএম

যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে বৈধ কাগজপত্রের তোয়াক্কা না করে সুকৌশলে পণ্য পাচারের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে একটি ভারতীয় ট্রাক জব্দ এবং একটি বাংলাদেশি ট্রাকসহ তার চালককে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য ও বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার ৯ কর্মীসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুজনকে মিলিয়ে মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
আজ শনিবার (২৭ জুন) বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. ওবাইদুল মিয়া বাদী হয়ে বেনাপোল পোর্ট থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। বন্দরে কঠোর নিরাপত্তা জালের মধ্যেও এমন সংঘবদ্ধ চুরির ঘটনা সামনে আসায় ব্যবসায়ী মহলে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
কাস্টমস ও বন্দর সূত্রে জানা গেছে, যশোরের ঝিকরগাছা এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজের নামে ভারত থেকে আমদানি করা সরিষার খৈল বোঝাই একটি ভারতীয় ট্রাক গত ২৩ জুন রাত ৯টার দিকে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। নথিপত্র অনুযায়ী, গত ২৫ জুন ট্রাকটি ৩৫ নম্বর শেডে পণ্য খালাসের উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা বলে ইয়ার্ড থেকে বের হয়। তবে নির্ধারিত শেডে না গিয়ে ট্রাকটি অন্য এক গোপন মিশনে নামে।
অভিযোগ উঠেছে, ওই ভারতীয় ট্রাকে সরিষার খৈলের আড়ালে আনা হয়েছিল ৫০ বস্তা অত্যন্ত দামি শাড়ি, থ্রিপিস ও কসমেটিকস সামগ্রী। চক্রটি কৌশলে ৩২ নম্বর ইয়ার্ডে নিয়ে ভারতীয় ট্রাক থেকে ওই চোরাই পণ্যগুলো একটি বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তর করে। এরপর বিকেলে কোনো অনুমতি বা গেট পাস ছাড়াই ভারতীয় ট্রাকটি ৩১ নম্বর ইয়ার্ডে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে বন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তাদের খটকা লাগে এবং তারা গাড়িটি আটকে দেন। খবর পেয়ে বেনাপোল কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং তাঁর উপস্থিতিতে ট্রাকটিতে তল্লাশি চালানো হয়।
পরবর্তীতে ভারতীয় ট্রাকটি ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে নিয়ে ওজন করা হলে দেখা যায়, মূল কাগজের ঘোষিত ওজনের চেয়ে ট্রাকে দুই হাজার ৭৮৪ কেজি পণ্যের ঘাটতি রয়েছে। এ সময় কাস্টমস কর্মকর্তারা ওই ট্রাক থেকে ১৪০ বস্তা সরিষার খৈল এবং ৫০টি খালি বস্তা জব্দ করেন। অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে ভারতীয় ট্রাকচালক দ্রুত চম্পট দিলেও চোরাই পণ্য বোঝাই করা বাংলাদেশি ট্রাক এবং তার চালককে হাতেনাতে ধরে ফেলে পুলিশে দেওয়া হয়। জানা গেছে, পণ্য পাচারের এই বড় চালানের পেছনে চক্রটি সুকৌশলে মেসার্স প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের নাম ব্যবহার করেছিল। তবে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানটি এই জালিয়াতির সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক কাজী রতন জানান, প্রাথমিক তদন্তের অংশ হিসেবে বন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা কোনো বৈধ গেট পাস বা কাগজপত্র যাচাই না করেই ট্রাক চলাচল ও মালামাল সরাতে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। এরপর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ কাজে ব্যবহৃত বাংলাদেশি ট্রাকটি চালক ও হেলপারসহ আটক করা হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “বন্দরে যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনে কর্তৃপক্ষ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। অপরাধী যেই হোক, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দায়িত্ব অবহেলার দায়ে প্রাথমিক তালিকায় থাকা ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্তে আরও কারও নাম এলে তাদেরও আসামি করা হবে।”
বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ হোসেন মামলা রুজু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনার গভীরে গিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
এদিকে বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, বন্দরে কোনো আমদানিকৃত পণ্যবাহী ট্রাক ঢুকলে প্রথমে বিজিবি তল্লাশি করে, তারপর কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের যৌথ ওজনে পরীক্ষা করা হয় এবং সবশেষে উন্নতমানের স্ক্যানিং মেশিনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এর ওপর পুরো বন্দরে প্রায় ৩৭৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। এত কঠোর নজরদারির মধ্যেও অসাধু চক্রের এমন দুঃসাহস কীভাবে হয়, তা ভাবনার বিষয়। নজরদারির এই ফাঁকফোকরের কারণে সরকার যেমন কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বন্দরের বাণিজ্যিক নিরাপত্তাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
মন্তব্য