খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ই জুন ২০২৬, ১১:৫৯ পিএম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র আলোড়ন ও আলোচনার সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলি মন্ত্রীসভার প্রকাশ্য ক্ষোভের জবাবে জেডি ভ্যান্স অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আপনাদের একমাত্র মিত্রকে আক্রমণ করবেন না।’ তিনি ইসরায়েলি প্রশাসনকে আরও মনে করিয়ে দেন যে, ইসরায়েল রাষ্ট্রকে রক্ষাকারী সামগ্রিক অস্ত্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মার্কিন নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকায় এবং আমেরিকার কারখানায় তৈরি হয়।
Table of Contents
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এতটাই গভীর যে, বিশিষ্ট ভারতীয় চিত্রশিল্পী ও কলামিস্ট কমলেশ সিংয়ের মতে, ‘ইসরায়েল হলো যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যের মধ্যে প্রথম।’ যদিও বর্তমানে এই কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে, তবে এটি পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে উভয় দেশই ভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি বড় যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের গা বাঁচাতে চাইছে, অন্যদিকে ইসরায়েল চাইছে লেবাননে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে কঠোরভাবে দমন করতে।
দুই মিত্রের মধ্যে এই ঝামেলার মূল সূত্রপাত হয় সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ১৪ দফা চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর। এই চুক্তিটি ইসরায়েলে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য নয়। অন্যদিকে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দেশের সামরিক বাহিনীকে (আইডিএফ) নির্দেশ দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোতে এককভাবে হামলা চালানোর জন্য যেন জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা হয়।
বাস্তব ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীকে (আইএএফ) বিশ্বের অন্যতম সেরা ও অপরাজেয় মনে করা হলেও এর মূল চালিকাশক্তি সম্পূর্ণভাবে মার্কিন অয়ারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রির ওপর নির্ভরশীল। ভারতের শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাংবাদিক এবং লেখক সন্দীপ উন্নীথানের মতে, এটিই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক দুর্বলতা।
ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর বহরে থাকা ৭৫টি এফ-১৫, ১৯৬টি এফ-১৬ এবং ৩৯টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সব কটিই আমেরিকার তৈরি। এ ছাড়া তাদের অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও ব্ল্যাক হক ট্রান্সপোর্ট হেলিকপ্টারগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি। এসব বিমানের ইঞ্জিন বা রাডার সিস্টেমের মতো জরুরি খুচরা যন্ত্রাংশ বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানি থেকে কিনতে হয়। আমেরিকা যদি কোনো কারণে এই যন্ত্রাংশের জোগান বন্ধ করে দেয়, তবে ইসরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলো ওড়ার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলবে।
canদীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত গোলাবারুদের নিজস্ব মজুত ইসরায়েলের নেই। তারা আমেরিকার তৈরি গাইডেড জেডিএএম কিট ও জিবিইউ-৩৯/বি স্মল ডায়ামিটার বোমার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এমনকি হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যার জন্য ব্যবহৃত বিএলইউ-১০৯ বাংকার-বাস্টার বোমাটিও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া। ২০২৫ সালে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে ইসরায়েলের বিশেষ ভারী বোমার (জিবিইউ-৫৭) প্রয়োজন ছিল, যা আমেরিকার সহায়তা ছাড়া তাদের পক্ষে পাওয়া বা ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না।
এরপর আসে আয়রন ডোম ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ইসরায়েলের বিখ্যাত ‘আয়রন ডোম’ ব্যবস্থাটি তাদের নিজেদের ডিজাইন করা হলেও এটি তৈরি হয় মার্কিন প্রতিরক্ষা জায়ান্ট আরটিএক্স-এর যৌথ উদ্যোগে। এই ব্যবস্থার তামির মিসাইল এবং ডেভিডস স্লিং-এর স্টানার মিসাইলের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও আমেরিকায় তৈরি হয়। তাছাড়া মার্কিন কংগ্রেস এই প্রতিরক্ষার জন্য নিয়মিত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল জুগিয়ে আসছে। যখনই ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ড্রোন ও মিসাইল হামলায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, তখনই মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে ইসরায়েলকে রক্ষা করেছে।
এই বিষয়ে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক উপ-প্রধান চাক ফ্রেইলিচ বলেন, কেবল নিজেদের বোমার উৎপাদন বাড়িয়ে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমানো যাবে না। কারণ সেই বোমা ফেলার জন্য বিমানগুলো আমেরিকার কাছ থেকেই আনতে হয়। তিনি আশির দশকের উদাহরণ টেনে বলেন, ইসরায়েল একবার নিজস্ব যুদ্ধবিমান ‘লাভি’ তৈরির চেষ্টা করেছিল, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১৮ শতাংশ গিলে খেয়ে অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। সীমিত সম্পদের একটি ছোট দেশের পক্ষে একা বিপুল অর্থ খরচ করে উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব। এমনকি তাদের নিজস্ব মেরকাভা ট্যাংক বা উন্নত আর্টিলারি সিস্টেমের ইঞ্জিন ও ট্রান্সমিশনও আসে মার্কিন তহবিল থেকে।
এই একই সুর শোনা গেছে অন্যান্য শীর্ষ প্রতিরক্ষা ব্যক্তিত্বদের কণ্ঠেও। দ্য জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইডিএফ-এর সাবেক উপ-প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) উজি দয়ান সতর্ক করে বলেন, ‘যেকোনো ব্যয়বহুল অস্ত্র তৈরি করা আমাদের জন্য বেশ কঠিন। আমাদের অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা আমাদের বুঝতে হবে।’ তবে ইসরায়েলের একমাত্র ব্যতিক্রম তাদের ‘নিজস্ব কৌশলগত অস্ত্র’। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল এই পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির জায়গায় ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাদের পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী ‘জেরিকো-৩’ ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এবং ক্রুজ মিসাইল বহনে সক্ষম ‘ডলফিন-ক্লাস’ সাবমেরিনগুলো জার্মানি থেকে সংগৃহীত।
টাইম ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর sighs থেকে এ পর্যন্ত তারা ১৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মার্কিন সামরিক সহায়তা পেয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে ওয়াশিংটন প্রতি বছর জেরুজালেমকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার দিয়ে আসছে, যার সিংহভাগই ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয়। এই অর্থায়ন মূলত ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং (এফএমএফ) নামক একটি প্রোগ্রামের আওতায় দেওয়া হয়। ইসরায়েল এই প্রোগ্রামের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী, যেখানে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মিশর পায় মাত্র ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই সম্পর্কটি একতরফা নয়। সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জন স্পেনসার তাঁর একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, এফএমএফ-এর মাধ্যমে ইসরায়েল যে তহবিল পায় তার প্রায় ৭৪ শতাংশ অর্থই তারা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সরঞ্জাম কেনার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য। স্পেনসার ব্যাখ্যা করেন, এই অর্থ আসলে আমেরিকার অর্থনীতি থেকে বাইরে যায় না। এটি মার্কিন কারখানা, মার্কিন সরবরাহ শৃঙ্খল এবং মার্কিন শ্রমিকদের মধ্যেই আবর্তিত হয়।
এফএমএফ-এর সহায়তার বাইরে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কোস্ট অব ওয়ার’ প্রজেক্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে আরও ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ২০২৩ সালে মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইসরায়েলের মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ আসত মার্কিন সাহায্য থেকে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে এই মার্কিন সহায়তার পরিমাণ কেবল বেড়েই চলেছে। এর বিনিময়ে মার্কিন সেনারা যুদ্ধে না জড়িয়েও ইসরায়েলের মাধ্যমে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং ড্রোন যুদ্ধের শিক্ষা লাভ করে। এ ছাড়া মোসাদের মতো ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে পাওয়া তথ্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে। ফলে, মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তার লাইফলাইন ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা বা শত্রুদের হাত থেকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা কার্যত অসম্ভব।
মন্তব্য