খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ১১:৫২ পিএম

আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পার্বত্য অঞ্চলে আজ শনিবার সন্ধ্যায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে এই ভূকম্পনের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ২। হিন্দুকুশের এই শক্তিশালী কম্পনের তীব্র ঝাঁকুনি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও অনুভূত হয়েছে। হঠাৎ মাটির এমন কেঁপে ওঠায় তিনটি দেশের লাখ লাখ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ভূগর্ভের অনেক গভীরে এই কম্পনের সৃষ্টি হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ভূমিকম্প গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪ মিনিটে এই ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ভূগর্ভের প্রায় ২১৫ কিলোমিটার গভীরে। উৎপত্তিস্থল ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক নিচে (ডিপ-ফোকাস) হওয়ার কারণে এর ঝাঁকুনি বিশাল ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত এই ধরনের গভীর ভূকম্পনগুলো ভূপৃষ্ঠে অনেক দূর পর্যন্ত কাঁপন ধরালেও এর তীব্রতা ওপরে এসে কিছুটা কমে যায়। ফলে বড় ধরনের তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও অনেকাংশে কম থাকে।
ভূমিকম্পটির মূল উৎপত্তিস্থল ছিল উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানের কালাফগান শহর থেকে প্রায় ৮১ কিলোমিটার দূরে। এই পার্বত্য অঞ্চলটি সিসমোলজিক্যাল দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। হিন্দুকুশের এই ধাক্কায় আফগানিস্তান ছাড়াও পাকিস্তান, ভারত, চীন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান এবং তুর্কমিনিস্তানের একাংশ তীব্রভাবে কেঁপে ওঠে। বিশেষ করে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় সোয়াত জেলাসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। সোয়াত জেলার বাসিন্দা দানিয়াল আহমদ জানান, সেখানে ঝাঁকুনিটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি বেশ কিছু সময় ধরে স্থায়ী হয়েছিল। পরবর্তীতে আরও বড় কোনো কম্পন বা ‘আফটারশক’ হতে পারে—এমন আশঙ্কায় মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গায় ছুটে আসেন। এ সময় অনেক এলাকায় নারী ও শিশুদের কান্নাকাটি করতেও দেখা যায়।
ভূতাত্ত্বিক পরিমাপ অনুযায়ী, ৬ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্পকে ‘শক্তিশালী’ ক্যাটাগরি হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি ভূপৃষ্ঠের দুর্বল অবকাঠামো ও কাঁচা বাড়িঘরের ওপর মারাত্মক আঘাত করতে সক্ষম। তবে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় দুর্গত এলাকার সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে।
এদিকে আফগানিস্তানের এই বড় ভূমিকম্পের আগে বিগত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে আরও বেশ কয়েকটি ছোট-বড় ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। আজ শনিবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে ভারতের হিমাচল প্রদেশের চাম্বা জেলায় ৩ দশমিক ২ মাত্রার একটি মৃদু ও অগভীর ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার।
অন্যদিকে ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের (ইএমএসসি) তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় পাকিস্তানে পরপর চারটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পনটি আঘাত হানে আজ শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৬ মিনিটে, যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান অঞ্চলের এই ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ৪০ কিলোমিটার। একই সময়ে বিশ্বের অন্য প্রান্তেও প্রকৃতির রুদ্ররূপ দেখা গেছে। গত বুধবার কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ভেনেজুয়েলা। এর মধ্যে দ্বিতীয় কম্পনটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫, যা দেশটির গত এক শতাব্দীতে আঘাত হানা অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প। ল্যাটিন আমেরিকার ওই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং নিখোঁজ আছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। সেই তুলনায় হিন্দুকুশের এই ভূমিকম্পে এশিয়া বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে বলা যায়।
মন্তব্য