খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুন ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মাতৃস্নেহ, সাহস, সত্যের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির ইতিহাসে যে কটি নাম চিরভাস্বর, তাঁদের অন্যতম শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তিনি ছিলেন একাধারে লেখিকা, শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক, সমাজচিন্তক এবং একাত্তরের ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় নেত্রী।
তাঁর অমর সৃষ্টি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ কেবল একটি ডায়েরি নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল, যেখানে একজন মায়ের হৃদয়ের আর্তনাদ, একজন দেশপ্রেমিকের সংগ্রাম এবং একটি জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী দেশের স্বাধীনতার জন্য গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। একের পর এক সফল অভিযানের পর তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং নির্মম নির্যাতনের পর শহীদ হন। বিজয়ের পর রুমীর সহযোদ্ধারা জাহানারা ইমামকে শুধু রুমীর মা নয়, সমগ্র মুক্তিযোদ্ধাদের মা হিসেবে বরণ করে নেন। সেই থেকেই তিনি আমাদের প্রিয় ‘শহীদ জননী’।
১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মাতা সৈয়দা হামিদা বেগম। তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে বেড়ে উঠেও তিনি শিক্ষার আলোয় নিজেকে সমৃদ্ধ করেন এবং নারীশিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৭ সালে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ও বাংলায় এমএ সম্পন্ন করেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে শিক্ষা বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
শিক্ষকতা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম ব্রত। ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বুলবুল একাডেমি, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে তিনি নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে তিনি জ্ঞানের প্রদীপ প্রজ্বলিত করেছেন।
স্বাধীনতার পর তিনি শুধু একজন শোকাহত মা হয়ে থাকেননি; যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আজীবন সোচ্চার থেকেছেন। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁর আপসহীন অবস্থান তাঁকে জাতির বিবেকের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরের সাইনাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সাহস, দেশপ্রেম এবং ন্যায়বিচারের সংগ্রাম আজও বাঙালির প্রেরণার চিরন্তন উৎস।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম আমাদের শিখিয়েছেন—একজন মায়ের ভালোবাসা যেমন সীমাহীন, তেমনি দেশের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাও হতে পারে অনন্ত।
তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, বিনম্র কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ছালা।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, শহীদ জননী।
আপনি বেঁচে থাকবেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ন্যায়ের সংগ্রাম এবং প্রতিটি দেশপ্রেমিক হৃদয়ের গভীরে।
মন্তব্য