খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই মে ২০২৬, ১১:২৫ পিএম

দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীকে আরও গতিশীল, জনবান্ধব ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে একগুচ্ছ সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এসব উদ্যোগের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিক্ষিত অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার জন্য ‘ওভারটাইম ভাতা’ প্রবর্তন এবং অবসরকালীন সময়ে ‘অনারারি পদোন্নতি’র বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রোববার (১০ মে, ২০২৬) রাজধানী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ অডিটরিয়ামে আয়োজিত ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভায়’ এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
Table of Contents
‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে উৎসবমুখর পরিবেশে এই সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর তিনি পুলিশ অডিটরিয়ামে বাহিনীর সদস্যদের সাথে এক বিশেষ কল্যাণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সুশৃঙ্খল প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন। পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং জনসেবায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও সততা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে পুলিশের ভূমিকা অপরিহার্য এবং সরকার বাহিনীর যৌক্তিক চাহিদা পূরণে সচেষ্ট রয়েছে।
কল্যাণ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘদিনের একটি দাবির বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সদস্য অর্থাৎ কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পর্যন্ত যারা নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন, তাদের জন্য বিশেষ নীতিমালার অধীনে ‘ওভারটাইম ভাতা’ প্রবর্তনের কাজ চলছে। বর্তমানে পুলিশ সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করলেও কোনো অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পান না। এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে বাহিনীর তৃণমূল পর্যায়ে সদস্যদের আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়বে এবং কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হবে। সরকারি এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ইতিমধ্যে প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করছে।
চাকরির শেষ পর্যায়ে এসে সদস্যদের মনোবল অটুট রাখতে এবং যোগ্যতার স্বীকৃতি দিতে ‘অনারারি পদোন্নতি’র নতুন নিয়ম চালু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সভায় জানানো হয়, যে সকল পুলিশ সদস্য দীর্ঘ সময় একই পদে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং যাদের চাকরির রেকর্ড সন্তোষজনক, তারা অবসরের প্রাক্কালে বিশেষ পদোন্নতির সুযোগ পাবেন। এই নিয়ম অনুযায়ী:
যোগ্য কনস্টেবলগণ পদোন্নতি পেয়ে অনারারি এএসআই (Assistant Sub-Inspector) হতে পারবেন।
এএসআই পদমর্যাদার সদস্যরা অনারারি এসআই (Sub-Inspector) পদে পদোন্নতি পাবেন।
এসআই পদমর্যাদার সদস্যরা পদোন্নতি পেয়ে অনারারি পরিদর্শক (Inspector) হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন।
এই পদক্ষেপটি মূলত দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রাপ্তি হিসেবে বাহিনীর সদস্যদের মাঝে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।
পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে সভায় জানানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রতিশ্রুতি দেন যে, রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ বিভাগীয় পর্যায়ের সকল হাসপাতালগুলোকে বিশ্বমানের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্বারা সজ্জিত করা হবে। এছাড়া বাহিনীর সদস্যদের উন্নত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য নতুন হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়টিও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট নিরসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। নতুন নতুন ভূমি অধিগ্রহণ এবং আধুনিক আবাসিক ভবন নির্মাণের মাধ্যমে সদস্যদের উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের আবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করার বিষয়টি সভায় নিশ্চিত করা হয়।
আগামী ১৩ মে সমাপ্ত হতে যাওয়া এই পুলিশ সপ্তাহ বাহিনীর সদস্যদের জন্য এক নতুন উদ্দীপনা ও বার্তা বয়ে এনেছে। বিগত বছরের কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং আগামী বছরের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের এই মঞ্চ থেকে আসা ঘোষণাগুলো সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে ওভারটাইম ভাতার বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে তা পুলিশের কর্মসংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তগুলো পুলিশ বাহিনীকে একটি জনমুখী ও আধুনিক সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পেশাদারিত্বের সাথে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার যে লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে, পুলিশ বাহিনী তা অর্জনে বদ্ধপরিকর।
মন্তব্য