খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ৩:২৪ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় সুদের টাকা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে টানা তৃতীয় দিনের মতো দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল থেকে উপজেলার কালিকচ্ছ বাজার ও আশপাশের এলাকায় সূর্যকান্দি ও ধরন্তি গ্রামের লোকজন দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের জেরে এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, ব্যাহত হয়েছে স্বাভাবিক জনজীবন এবং স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল প্রায় ৯টার দিকে দুই পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে উত্তেজনা সংঘর্ষে রূপ নেয়। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং হামলার ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে কালিকচ্ছ বাজারের কয়েকটি দোকানপাট ও আশপাশের কিছু বসতবাড়িতে ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাটের অভিযোগও ওঠে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী দ্রুত দোকানপাট বন্ধ করে এলাকা ত্যাগ করেন। এতে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
সংঘর্ষের প্রভাব পড়ে সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই সড়কেও। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে যাত্রী, কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক ঘণ্টা ধরে সড়কে যান চলাচল প্রায় সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত ছিল।
পুলিশ জানায়, এই সংঘর্ষের মূল সূত্রপাত সুদের এক লাখ টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, সূর্যকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মোশারফ মিয়া দাবি করেন, পার্শ্ববর্তী ধরন্তি গ্রামের মো. খাদিমের কাছে তাঁর সুদের এক লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। কিন্তু ওই টাকা পরিশোধ না করাকে কেন্দ্র করে গত রোববার রাতে দুই গ্রামের লোকজনের মধ্যে প্রথম দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই সংঘর্ষের সময় খাদিম নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং দুই গ্রামের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
খাদিমের মৃত্যুর পর সোমবার বিকেলে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে আবারও দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা ওই সংঘর্ষে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনজুর কাদের ভূঁইয়াসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও ছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে একাধিকবার হস্তক্ষেপ করতে হয়। তবে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত না হওয়ায় মঙ্গলবার সকালে আবার নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়।
মঙ্গলবারের সহিংসতায় আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। চিকিৎসকদের মতে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের আঘাত গুরুতর হলেও অধিকাংশই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বিরোধ, আর্থিক লেনদেনের জটিলতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খাদিমের মৃত্যুর পর সেই বিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং পরপর তিন দিন ধরে সংঘর্ষ চলতে থাকে। ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলছেন এবং নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নতুন করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংঘর্ষের কারণে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে উত্তেজনা প্রশমিত হবে এবং সরাইলের ক্ষতিগ্রস্ত জনজীবন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
মন্তব্য