গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি) এবং প্রতিবেশী উগান্ডায় নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এ প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
ডব্লিউএইচও-এর তথ্য অনুযায়ী, এ প্রাদুর্ভাবের সূত্রপাত পূর্ব কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশে। সেখানে ইবোলা ভাইরাসের একটি বিরল ধরন ‘বুন্ডিবুগিও’ শনাক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ইবোলার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট কার্যকর চিকিৎসা নেই, যা রোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ইতুরি প্রদেশে শুরু হওয়া সংক্রমণ পরবর্তীতে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসাতেও আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যা ভাইরাসটির ভৌগোলিক বিস্তার আরও বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মধ্য আফ্রিকা অঞ্চলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ডব্লিউএইচও মূল্যায়ন করেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে জরুরি নজরদারি, আক্রান্তদের শনাক্তকরণ এবং আইসোলেশন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর্যবেক্ষণে রাখার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটিকে এখনই বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। সংস্থাটির মতে, মহামারি ঘোষণার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত মানদণ্ড এখনো পূরণ হয়নি। তবে সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থাটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সীমান্ত বন্ধ না করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, সীমান্ত বন্ধের মতো পদক্ষেপ অনেক সময় তথ্য আদান-প্রদান ও রোগী শনাক্তকরণে বাধা সৃষ্টি করে, যা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কার্যকারিতা কমাতে পারে।
ইবোলা ভাইরাস সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল যেমন রক্ত, বমি ও অন্যান্য শারীরিক নিঃসরণের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানান, রোগের প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে জ্বর, দুর্বলতা, মাথাব্যথা এবং পেশীতে ব্যথা দেখা দিতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
ডিআরসি ও উগান্ডায় স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা প্রদান এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যাতে মানুষ উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন হয়ে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরীক্ষাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সংস্থাটির মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো গেলে সংক্রমণের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বর্তমানে ডব্লিউএইচও এবং সংশ্লিষ্ট দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সংক্রমণের ধারা, নতুন রোগী শনাক্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
