রংপুরে ক্যাডেট এএসআই (নিরস্ত্র) পদের নিয়োগ পরীক্ষায় ভুয়া প্রবেশপত্র ও প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহের মাধ্যমে জালিয়াতির এক মারাত্মক অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মচারীর নেতৃত্বাধীন এ চক্রের পেছনের চক্রটিকে ধরতে জোর অভিযান চলছে। জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকুরির প্রত্যাশীদের কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
গতিবিধি দেখে সন্দেহ ও কেন্দ্রে হাতেনাতে গ্রেফতার
রংপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে আয়োজিত নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ওই কেন্দ্রের মূল ফটকের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা সদস্যদের নজর পড়ে আশরাফুল ইসলাম নামে এক তরুণের অস্বাভাবিক গতিবিধির ওপর। পুলিশ সন্দেহবশত তাকে থামিয়ে তার পরীক্ষা সংক্রান্ত কাগজপত্র তল্লাশি শুরু করে।
যাচাই-বাছাইয়ের এক পর্যায়ে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, তার কাছে থাকা ক্যাডেট এএসআই পদের প্রবেশপত্রটি ভুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রস্তুত করা। ঠিক একই সময়ে আসল পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে প্রক্সি দিতে আসা তাজমিলুর রহমান নামের আরও এক তরুণকে উক্ত কেন্দ্র থেকে আটক করে ডিবি সদস্যরা।
পরীক্ষার আগেই অগ্রিম টাকা ও হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া এডমিট কার্ড
আটককৃত প্রার্থীর দেওয়া তথ্য ও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ থেকে জালিয়াতি চক্রের অভিনব অপরাধ কৌশলের চিত্র ফুটে ওঠে। প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম স্বীকার করেন, তিনি পুলিশে চাকরির বাধ্যতামূলক ধাপ অর্থাৎ শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষাতেই অংশ নেননি।
অথচ তাকে সরাসরি লিখিত পরীক্ষায় বসিয়ে পাস করানোর আশ্বাস দেয় চক্রটি। এই চুক্তির জন্য ফায়ার সার্ভিস কর্মী বাদশা মাসউদ আলম ও তার সহযোগী নুরুল ইসলাম আশরাফুলের কাছে ১৭ লাখ টাকা দাবি করে। চুক্তি পাকা করতে আশরাফুল দিনাজপুর থেকে ঢাকা ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে অগ্রিম আড়াই লাখ টাকা (২,৫০,০০০ টাকা) পাঠায়। টাকা পাওয়ার পরই চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে তাকে একটি ভুয়া প্রবেশপত্র পাঠায়, যা দিয়ে সে কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করে।
গ্রেফতার ও অভিযুক্তদের বিস্তারিত তালিকা
| ক্র. নং | নাম | বয়স | ঠিকানা ও পরিচিতি | বর্তমান আইনি অবস্থা |
| ১ | মো. আশরাফুল ইসলাম | ২১ | পার্বতীপুর, দিনাজপুর | গ্রেফতারকৃত প্রাক-পরীক্ষার্থী |
| ২ | মো. তাজমিলুর রহমান | ১৯ | রংপুর | গ্রেফতারকৃত প্রক্সি পরীক্ষার্থী |
| ৩ | মো. বাদশা মাসউদ আলম | ৪৮ | ফায়ার সার্ভিস কর্মচারী, কামালকাছনা, রংপুর | গ্রেফতার (চক্রের মূল হোতা) |
| ৪ | নুরুল ইসলাম | ২০ | রংপুর | গ্রেফতারকৃত সহযোগী |
| ৫ | মো. নুরুল ইসলাম | ৪৬ | রংপুর | পলাতক অভিযুক্ত |
মূল পরিকল্পনাকারী আটক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ
আশরাফুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে রংপুর নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড় এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। সেখান থেকে মূল পরিকল্পনাকারী ফায়ার সার্ভিস কর্মী বাদশা মাসউদ আলমকে গ্রেফতার করা হয়।
তার কাছে থাকা স্মার্টফোনটি উদ্ধার করে ফরেনসিক যাচাই-বাছাই শুরু করলে ভুয়া প্রবেশপত্র তৈরি, অর্থ লেনদেনের মেসেজ এবং জাল দলিলের ডিজিটাল প্রমাণ পায় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে বাদশা মাসউদ স্বীকার করেন, তারা একটি সংঘবদ্ধ গ্যাং পরিচালনা করছিলেন। নিয়োগ প্রত্যাশীদের সঙ্গে চুক্তি করার পর তারা নিজেদের সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দাবি করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিতেন এবং তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতেন।
আইনি ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক তৎপরতা
ঘটনার সার্বিক তদন্ত শেষে কোতোয়ালি মেট্রোপলিটন থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে আটক চারজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং পলাতকদের গ্রেফতারের জোর চেষ্টা চলছে।
রংপুর কোতোয়ালি মেট্রোপলিটন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সরকারি সংস্থায় চাকরি দেওয়ার নাম করে গড়ে ওঠা এই ধরনের প্রতারক চক্রের শিকড় অনেক গভীরে থাকতে পারে। পলাতক আসামি নুরুল ইসলামসহ চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে পুলিশ ও গোয়েন্দা টিম মাঠে কাজ করছে।









