ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত স্থানান্তর বা সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করার বিনিময়েও দেশটির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত কোনো অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না বলে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে ওয়াশিংটনের অনড় ও কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি এই মন্তব্য করেন।
টেলিফোন সাক্ষাৎকার ও ট্রাম্পের অনমনীয় অবস্থান
গত বুধবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ‘পিবিএস নিউজ’-কে দেওয়া একটি বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের এই সুনির্দিষ্ট ও কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘সিএনএন’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়।
উক্ত সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিকট সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সমঝোতার যে প্রাথমিক খসড়া বা রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, সেখানে ইরানের পক্ষ থেকে উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বিনিময়ে তাদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বা শিথিল করার কোনো শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কি না?
এই প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্ট ভাষায় নেতিবাচক উত্তর দেন। তিনি বলেন, না, এমন কোনো শর্ত বা সম্ভাবনা একেবারেই নেই। ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কোনোভাবেই প্রত্যাহার করা হবে না, কখনোই নয়। তিনি নিজের বক্তব্য আরও স্পষ্ট করে যোগ করেন যে, দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইরান তাদের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সমস্ত মজুত ত্যাগ করবে ঠিকই, তবে এই ইউরেনিয়াম ত্যাগের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তারা কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা ছাড় বা অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করবে না। মার্কিন প্রশাসনের নীতি অনুযায়ী এটি একেবারেই অসম্ভব একটি বিষয়।
নিচে একটি সুবিন্যস্ত টেবিলের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাক্ষাৎকার, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞার বর্তমান পরিস্থিতির মূল বিবরণ সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল অবস্থান | সাক্ষাৎকারের প্রধান মাধ্যম ও সূত্র | সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রভাব ও জটিলতা |
| উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর | ইরানকে তাদের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে | পিবিএস নিউজ (টেলিফোন সাক্ষাৎকার) ও সিএনএন প্রতিবেদন | ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতা |
| অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা | ইউরেনিয়াম ত্যাগের বিনিময়েও কোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না | ডোনাল্ড ট্রাম্প (মার্কিন প্রেসিডেন্ট) | মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসনের প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধকতা |
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলের পরোক্ষ মধ্যস্থতা ও বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক সহায়তায় যখন একটি খসড়া চুক্তির বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও সমঝোতার প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অত্যন্ত অনমনীয় ও কঠোর মন্তব্য প্রকাশ পেল। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল যখন মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসন এবং ওই অঞ্চলে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা মন্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ বজায় রাখার যে বিশেষ নীতি ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করে আসছে, প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য মূলত সেই পূর্ববর্তী নীতিরই একটি ধারাবাহিক প্রতিফলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অনড় ও অপরিবর্তিত অবস্থানের কারণে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এবং একটি সম্ভাব্য স্থায়ী শান্তিচুক্তি ও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় নতুন করে বড় ধরনের জটিলতা ও অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মহল ধারণা প্রকাশ করছে।
