খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ৭:৫৬ পিএম

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু ফুটবলের মহারণ হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকেনি; জমকালো এক হাফটাইম শোর আয়োজনও এটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। সুপার বোলের আদলে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে মঞ্চ মাতিয়েছেন পপসংগীতের কিংবদন্তি ম্যাডোনা, লাতিন সংগীতের তারকা শাকিরা, কানাডীয় গায়ক জাস্টিন বিবার এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘টেড ল্যাসো’র তারকা জেসন সুডেইকিস ও ব্রেন্ডন হান্ট। শিশুদের প্রিয় চরিত্র ‘দ্য মাপেটস’-এর উপস্থিতিও অনুষ্ঠানে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
এত বড় তারকাসমাবেশ দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই শিল্পীরা কি পারফরম্যান্সের জন্য বিপুল অর্থ পেয়েছেন? বিশেষ করে যাঁদের ব্যক্তিগত কনসার্টে অংশ নিতে আয়োজকদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাঁদের বিশ্বকাপের মতো বিশাল মঞ্চে আনতে পারিশ্রমিক কত ছিল, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরটি অনেকের ধারণার বিপরীত। এই হাফটাইম শোতে অংশ নেওয়া শিল্পীরা পারফরম্যান্সের জন্য কোনো সরাসরি পারিশ্রমিক নেননি।
Table of Contents
ফুটবল বিশ্বকাপে এমন হাফটাইম শো আয়োজনের ধারণাটি ছিল নতুন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগের সবচেয়ে বড় আয়োজন সুপার বোল বহু বছর ধরে তারকা শিল্পীদের নিয়ে বিশাল হাফটাইম অনুষ্ঠানের জন্য পরিচিত। মাইকেল জ্যাকসন, প্রিন্স, বিয়ন্সে, রিহানা, লেডি গাগা ও কেনড্রিক লামারের মতো শিল্পীরা এই মঞ্চে পারফর্ম করেছেন।
সেই মডেলের অনুপ্রেরণায় ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিফাও ফাইনালের বিরতিকে বড় বিনোদন আয়োজনের রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ ছিল আরও একটি কারণে বিশেষ। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেয় টুর্নামেন্টে। ফলে আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল ফুটবলের পাশাপাশি সংগীত ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির মাধ্যমে বিশ্বকাপের দর্শক-আকর্ষণ আরও বাড়ানো।
বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায় ক্রীড়া ও বিনোদনের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, হাফটাইম শোর মাধ্যমে সেই সংস্কৃতির একটি অংশ বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবল আসরে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।
ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন ও আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ে গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। শেষ পর্যন্ত ফেরান তোরেসের গোলে স্পেন ১-০ ব্যবধানে জয় পায়।
তবে ম্যাচের ফলাফলের পাশাপাশি হাফটাইম শোও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে। সাধারণ ফুটবল ম্যাচে বিরতির সময় প্রায় ১৫ মিনিট হলেও বিশেষ এই অনুষ্ঠানের কারণে বিরতি প্রায় ২৭ মিনিট পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। আর এতেই আপত্তি জানান কিছু ফুটবলপ্রেমী।
তাঁদের মতে, দীর্ঘ বিরতির কারণে ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে অনুষ্ঠানের সমর্থকদের বক্তব্য, বিশ্বকাপ এখন শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোর একটি। তাই সংগীত ও বিনোদনের এমন সংযোজন বিশ্বকাপকে আরও বৈশ্বিক দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও বিশ্লেষক ওয়েন রুনিও অনুষ্ঠানটি নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি শিল্পীদের পছন্দ করেন বলে জানালেও হাফটাইম শোটি তাঁর ভালো লাগেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। কেউ এটিকে বিশ্বকাপের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ মনে করেছেন, ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর সঙ্গে এমন দীর্ঘ বিনোদন পর্ব ঠিক মানানসই নয়।
ম্যাডোনা, শাকিরা, জাস্টিন বিবার ও বিটিএস—প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক বিনোদন জগতের বড় নাম। তাঁদের ব্যক্তিগত কনসার্ট কিংবা বাণিজ্যিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য সাধারণত বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাই বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ক্রীড়া মঞ্চে তাঁদের পারফরম্যান্সের বিনিময়ে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, হাফটাইম শোতে অংশ নেওয়া কোনো শিল্পীকেই সরাসরি পারফরম্যান্স ফি দেওয়া হয়নি। তাঁরা স্বেচ্ছায় অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে অনুষ্ঠানটির জন্য কোনো ব্যয় হয়নি। এত বড় আয়োজনের মঞ্চ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, প্রযোজনা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে শিল্পীদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ফি না দেওয়ার বিষয়টিই এখানে মূল আলোচ্য।
হাফটাইম শোটি শুধু দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়নি। এটি ফিফা ও গ্লোবাল সিটিজেনের একটি সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। শিল্পীরা পারিশ্রমিক ছাড়াই পারফর্ম করে ফিফা গ্লোবাল সিটিজেন এডুকেশন ফান্ডের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে ভূমিকা রাখেন।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা এবং ফুটবল খেলার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। ফলে বিশ্বকাপের কোটি কোটি দর্শকের সামনে হাফটাইম শোকে একটি সামাজিক বার্তা প্রচারের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো হাফটাইম শো ঘোষণার সময় বলেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল ম্যাচের এই আয়োজন শুধু বিনোদনের উপলক্ষ হবে না; এর মাধ্যমে শিক্ষা, ঐক্য ও মানবিকতার বার্তাও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।
এই ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে সুপার বোলের সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে বারবার। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগের ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনেও অনেক সময় শিল্পীরা সরাসরি পারফরম্যান্স ফি পান না। আয়োজকেরা সাধারণত অনুষ্ঠানটির প্রযোজনা ব্যয় বহন করেন, আর শিল্পীরা পান বিশ্বের বিশাল দর্শকসমাজের সামনে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ।
বিশ্বকাপের হাফটাইম শোতেও অনেকটা একই ধারণা দেখা গেছে। বিশ্বকাপের মতো একটি মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ শিল্পীদের জন্য নিজেই বিরাট প্রচারণার ক্ষেত্র তৈরি করে। একই সঙ্গে সামাজিক উদ্যোগের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
তবে এই আয়োজন ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের স্থায়ী অংশ হবে কি না, তা সময়ই বলবে। হাফটাইম শো একদিকে ফুটবল ও বৈশ্বিক বিনোদনের মধ্যে নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করেছে, অন্যদিকে ম্যাচের ঐতিহ্য ও দর্শকদের প্রত্যাশা নিয়ে নতুন বিতর্কও উসকে দিয়েছে। 2026 বিশ্বকাপের ফাইনাল তাই শুধু মাঠের ফলাফলের জন্য নয়, ফুটবল ও বিনোদনের এই নতুন সংযোগের কারণেও আলোচনায় থাকবে।
মন্তব্য