খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ৩:৪৩ পিএম

বাংলা সাহিত্য, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চিন্তার ইতিহাসে আবুল ফজল এক অনন্য নাম। শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সমাজচিন্তক ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি কেবল সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেননি, বরং সমাজে যুক্তিবাদী ও মানবিক চিন্তার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর দর্শন, সাহিত্যকর্ম এবং জনজীবনে অবস্থান আজও নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান, মানবতা ও মুক্তচিন্তার পথে অনুপ্রাণিত করে।
১৯০৩ সালের ১৭ জুলাই চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা মৌলভী ফজলুর রহমান ছিলেন চট্টগ্রাম জুমা মসজিদের ইমাম। ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা আবুল ফজলের শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় মাদ্রাসায়। পরে তিনি আধুনিক শিক্ষার পথে এগিয়ে গিয়ে উচ্চশিক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৩১ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিটি এবং ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
পেশাজীবনের শুরু হয় ইমামতি দিয়ে। পরে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৪১ সালে কৃষ্ণনগর কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর ১৯৪৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজে বদলি হন। সেখানে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করে ১৯৫৬ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতেও বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
স্বাধীনতার পর দেশের উচ্চশিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং ১৯৩০ সালে সংগঠনটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। সমাজে কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও অন্ধ অনুকরণের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশই ছিল এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য। সংগঠনটির মুখপত্র ‘শিখা’-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’। সেই আন্দোলনের মূল বাণী—
“জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।”
এই একটি বাক্যই আবুল ফজলের চিন্তাজগতের সারমর্ম বহন করে। তাঁর প্রবন্ধ, উপন্যাস, গল্প ও অন্যান্য রচনায় মুক্তবুদ্ধি, মানবতাবাদ, সত্যনিষ্ঠা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সামাজিক ন্যায়বোধ এবং দেশপ্রেম ধারাবাহিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
দেশের সাংস্কৃতিক ও জাতীয় সংকটের সময়ও তিনি নীরব থাকেননি। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসংগীত প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তিনি প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষায় তাঁর এই অবস্থান তাঁকে সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা এনে দেয়।
সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবদান সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, আত্মকথা, ধর্মবিষয়ক রচনা এবং ভ্রমণসাহিত্যে তিনি স্বকীয়তা ও চিন্তার গভীরতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে চৌচির, প্রদীপ ও পতঙ্গ, মাটির পৃথিবী, বিচিত্র কথা, রাঙা প্রভাত, রেখাচিত্র এবং দুর্দিনের দিনলিপি। এসব রচনায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জীবদ্দশায় একাধিক সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৬৩ সালে প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৬৬ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮০ সালে নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক, ১৯৮১ সালে মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৮২ সালে আবদুল হাই সাহিত্য পদকে ভূষিত হন। এর আগে ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।
১৯৮৩ সালের ৪ মে চট্টগ্রামে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর প্রস্থান বাংলা সাহিত্য ও চিন্তার জগতে শূন্যতা তৈরি করলেও তাঁর রচনা, দর্শন এবং মুক্তবুদ্ধির আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। জ্ঞানচর্চা, যুক্তিনির্ভর চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণের যে স্বপ্ন তিনি লালন করেছিলেন, তা এখনও বাংলাদেশের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনুপ্রেরণার উৎস।
জন্মবার্ষিকীতে বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে। তাঁর জীবন, কর্ম এবং আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জ্ঞান, যুক্তি ও মানবতার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে—এমন প্রত্যাশাই রয়ে গেছে।
মন্তব্য