বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য বিস্তৃত কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সঠিক নীতি বাস্তবায়ন ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের জনমিতিক সুবিধা, তরুণ ও সক্ষম জনশক্তির অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করবে।
আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এসব লক্ষ্য অর্জিত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোয় রূপ দিতে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১০টি অগ্রাধিকারের সারসংক্ষেপ
| ক্রম | অগ্রাধিকার ক্ষেত্র | মূল লক্ষ্য |
|---|---|---|
| ১ | সবার জন্য উন্নয়ন | বৈষম্য হ্রাস ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা |
| ২ | শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা | দক্ষ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন |
| ৩ | সামাজিক সুরক্ষা | ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা |
| ৪ | বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান | শিল্পায়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি |
| ৫ | ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ | প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস |
| ৬ | আর্থিক স্থিতিশীলতা | ব্যাংক ও বাজারে আস্থা বৃদ্ধি |
| ৭ | জ্বালানি নিরাপত্তা | নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ |
| ৮ | তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়ন | ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণ |
| ৯ | পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা | জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন |
| ১০ | প্রশাসনিক দক্ষতা | স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা |
প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে ‘সবার জন্য উন্নয়ন’ নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বৈষম্য হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, যা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সহায়ক হবে।
তৃতীয় অগ্রাধিকার সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, যার মাধ্যমে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে জীবনচক্রভিত্তিক সহায়তা প্রদান করা হবে। চতুর্থ অগ্রাধিকার হিসেবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্পায়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ ত্বরান্বিত হয়।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ অগ্রাধিকার হিসেবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বেসরকারি খাতের আস্থা বাড়াবে। সপ্তম অগ্রাধিকার জ্বালানি নিরাপত্তা, যা উৎপাদন ধারাবাহিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অষ্টম অগ্রাধিকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্তার, যা দেশের অর্থনীতিকে আধুনিক ও ডিজিটাল কাঠামোর দিকে নিয়ে যাবে। নবম অগ্রাধিকার পরিবেশ ও পানিসম্পদ সংরক্ষণ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হবে। দশম অগ্রাধিকার প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, যা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করবে।
সরকারের মূল্যায়নে, এই দশটি অগ্রাধিকার সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের পথ সুগম হবে। একই সঙ্গে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল ও টেকসই উন্নয়ন কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
