খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুন ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

মানুষের সামাজিক এবং মানসিক জীবন একটি নির্দিষ্ট পরিধির মধ্যে আবর্তিত হয়। এই পরিমণ্ডলে পরিচিত মানুষের যাতায়াত, পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, স্বার্থের সংঘাত এবং সৌহার্দ্যের আদান-প্রদান ঘটে। তবে এই পরিচিত জগতের বাইরেও একটি বিশাল ধূসর এলাকা বা পরিধি বিদ্যমান থাকে, যেখানে সম্পর্কের কোনো দৃশ্যমানতা বা জানাশোনার কোনো যৌথ অতীত ইতিহাস থাকে না। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই অচেনা সীমানা থেকেও মাঝেমধ্যে তীব্র মানসিক আঘাত বা বিষাক্ত আক্রমণ ধেয়ে আসে। এই ধরনের অদৃশ্য বা বেনামী মানসিক আক্রমণ কোনো শারীরিক আঘাত নয়, সমাজ ও দর্শনের ভাষায় এর নাম হলো কুৎসা।
যার সাথে কোনোদিন মুখোমুখি আলাপচারিতাও হয়নি, যার সাথে কোনো পেশাদার বা ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই, এমনকি যার অস্তিত্বের সাথে নিজের দৈনন্দিন জীবনের দূরতম কোনো সংযোগও নেই—এমন কোনো ব্যক্তি যখন অন্য কারো নামে মিথ্যা অপবাদ, চরিত্র হনন কিংবা কুৎসা রটনা করেন, তখন মানব সভ্যতা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বৈরিতা ও বেনামী বিদ্বেষ মূলত মানব মনের এক জটিল বিকারের ইঙ্গিত দেয়। সাহিত্য, দর্শন এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, এই কুৎসা রটনা মূলত এক ধরনের ছায়াযুদ্ধ। যিনি বা যারা কুৎসা রটাচ্ছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে সামনের রক্তমাংসের মানুষটির সাথে লড়ছেন না; তারা মূলত লড়াই করছেন নিজেদের ভেতরের চরম অতৃপ্তি, হীনমন্যতা এবং আত্মিক একাকিত্বের সাথে।
Table of Contents
মনস্তত্ত্বের দুই বিখ্যাত মনীষী সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবং জাক লাকার মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে এই সম্পর্কহীন কুৎসাকারীদের মানসিক কঙ্কালটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের (১৮৫৬-১৯৩-৯) মতে, অকারণে কুৎসা রটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বাহ্যিক ঘটনা নয়, বরং এটি মানুষের ভেতরের এক অবদমিত ও বিকৃত আত্মরক্ষামূলক কৌশল। একে ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের ভাষায় প্রোজেকশন বা নিজের ভেতরের দোষ অন্যের উপর চাপানোর প্রবণতা বলা হয়। মানুষের মনের গভীর অন্ধকারে এমন কিছু কুৎসিত ইচ্ছা, ব্যর্থতা বা হীনমন্যতা লুকিয়ে থাকে যা সে নিজের সচেতন মনের কাছেও স্বীকার করতে পারে না। তখন মানুষের মন নিজের অহংকে এক অলীক পবিত্রতা বা শ্রেষ্ঠত্ব দিতে এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করে। ব্যক্তি নিজের ভেতরের সেই গোপন খামতি বা অনৈতিক বাসনাগুলোকে অন্যের চরিত্রের উপর আরোপ করে সান্ত্বনা খোঁজে। অর্থাৎ, কুৎসাকারী আসলে যার কুৎসা রটাচ্ছেন, তার মধ্যে নিজেরই অবদমিত অন্ধকার রূপটি দেখতে পান। এটি মানুষের আদিম অবদমিত ইচ্ছা (ইড) এবং সামাজিক নৈতিকতার (সুপারইগো) দ্বন্দ্বের এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ, যাকে এক ধরনের স্যাডিজম বা অন্যকে মানসিক কষ্ট দিয়ে সস্তা আনন্দ পাওয়ার মানসিকতা বলা যেতে পারে।
অন্যদিকে, ফরাসি মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক জাক লাকা (১৯০১-১৯৮১) এই মনস্তত্ত্বকে আরও গাঠনিক ও ভাষাতাত্ত্বিক রূপ দিয়েছেন। লাকার বিখ্যাত ‘দর্পণ পর্যায়’ তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ শৈশবে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে প্রথম নিজের অবয়ব সম্পর্কে এক অখণ্ড ধারণা পায়, যা আসলে এক ধরনের বিভ্রম মাত্র। কুৎসাকারীদের ক্ষেত্রে এই দর্পণ পর্যায়টি আজীবন এক মানসিক বিকার তৈরি করে। দূর থেকে সে যখন অন্য কোনো মানুষকে সম্পূর্ণ, সফল, সুন্দর বা সুখী দেখে, তখন তার নিজের ভেতরের অসম্পূর্ণ সত্তা বা ভাঙা প্রতিচ্ছবিটি তার সামনে আয়নার মতো ভেসে ওঠে। এই হীনমন্যতার দাহ সহ্য করতে না পেরে সে তখন ভাষার হিংস্র ব্যবহার শুরু করে। জাক লাকা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, মানুষ যা চায় তা আসলে তার নিজের চাওয়া নয়, তা হলো অন্যের আকাঙ্ক্ষা। কুৎসাকারী যখন দেখে অন্য একজন মানুষ এমন কিছু জীবনের স্বাদ বা আনন্দ উদযাপন করছে যা সে নিজে কখনো পায়নি, তখন তার মনে তীব্র ঈর্ষা জন্ম নেয়। কুৎসাকারী কিন্তু সামনের মানুষটার ধন-সম্পদ কেড়ে নিতে চায় না, সে চায় সামনের মানুষটার সুখ ও আনন্দকে ধুলিস্যাৎ করতে। কুৎসা রটানো হলো সেই আনন্দ কেড়ে নেওয়ার একটি হিংস্র মনস্তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে অকারণে কুৎসা রটনা হলো আত্মার চরম দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ। জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে (১৮৪৪-১৯০০) তাঁর দর্শনে ‘রিসেনটিমেন্ট’ বা পুঞ্জীভূত বিদ্বেষের ধারণার বর্ণনা দিয়েছেন। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে দুর্বল বা ব্যর্থ মানুষ নিজের অক্ষমতার জন্য তীব্র ক্ষোভ ও পুঞ্জীভূত বিদ্বেষ হৃদয়ে পুষে রাখে। যেহেতু সে নিজের চেষ্টায় উপরে ওঠার ক্ষমতা দেখতে পায় না, তাই সে এক ধরনের দাস-মানসিকতা থেকে অন্যের শ্রেষ্ঠত্বকে পাপ বা অন্যায় বলে প্রচার করতে শুরু করে। কুৎসা রটনাকারীরা হলো এই মানসিকতার জীবন্ত প্রতীক। আলো দেখলে অন্ধকারের যেমন দাহ উপস্থিত হয়, অকারণে কুৎসা রটনাকারী মানুষের মনস্তত্ত্ব ঠিক তেমন—সামনের মানুষটির কোনো অপরাধ নেই, তার অপরাধ কেবল সে আলো ছড়াচ্ছে বা সফল হচ্ছে। দার্শনিকরা মনে করেন মানুষ যখন নিজের জীবনের কোনো অর্থ খুঁজে পায় না, তখন তার অস্তিত্ব চরম শূন্যতাবাদে পর্যবসিত হয়, এবং তখন সে অন্যের জীবনকে কলঙ্কিত করার মধ্যে এক অলীক সার্থকতা খোঁজার চেষ্টা করে।
विश्व সাহিত্যের পাতা উল্টালে মানুষের এই অकारण পরশ্রীকাতরতা এবং কুৎসা রটনার বহু ধ্রুপদী ও কালজয়ী উদাহরণ মেলে। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের (১৫৬৪-১৬১৬) বিখ্যাত নাটক ওথেলো-র খলনায়ক ইয়াগোর কথা এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। ওথেলো বা ডেসডিমোনা ইয়াগোর কোনো ক্ষতি করেনি, তবুও কেবল অকারণ ঈর্ষা আর অন্যের পতন দেখার কুৎসিত আনন্দ পাওয়ার জন্য সে একের পর এক মিথ্যার জাল বুনে একটি নিটোল সুখী জীবন ধ্বংস করেছিল। ফরাসি উপন্যাসিক ও নাট্যকার আনোরে দ্য বালজাক (১৭৯৯-১৮৫০) তাঁর উপন্যাসে লিখেছেন যে, কুৎসা হলো সমাজের সেই বামনদের মতো যারা নিজেরা উচ্চতায় বড় হতে পারে না বলে তলোয়ার দিয়ে অপরের পা কেটে নিজের সমান করতে চায়। রুশ সাহিত্যিক ফিওদোর দসতয়েভসকি (১৮২২-১৮৮১) তাঁর মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’-এ দেখিয়েছেন মানুষ যখন নিজের ভেতরের সত্তাকে ভালোবাসতে পারে না, তখন সে অন্যের অস্তিত্বকে ঘৃণা করতে শুরু করে। এই উপন্যাসটিকে পৃথিবীর প্রথম অস্তিত্ববাদী উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উপন্যাসের মূল চরিত্র ও কথক একজন নামহীন ব্যক্তি, যাকে সাহিত্যে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান’ বলা হয়। সে সমাজের কোনো মূল ধারার সাথে যুক্ত নয় বা সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন। এই চরিত্রটি নিজের ব্যর্থতা, একাকীত্ব ও হীনমন্যতা থেকে পুরো সমাজ ও মানুষের উপর তীব্র ক্ষোভ উগরে দেয় এবং মানুষের ভালো থাকাকে মন থেকে ঘৃণা করে।
বাঙালি সংস্কৃতির পরতে পরতে এই ব্যাধির উপস্থিতি লক্ষ্য করে আমাদের কথাসাহিত্যিকরা তাঁদের অমর সৃষ্টিতে কুৎসাকারীদের চরিত্র নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসের বেণী ঘোষাল ও গোবিন্দ গাঙ্গুলী যেন আমাদের চারপাশের সেই চেনা কুৎসাকারীর আদি রূপ। রমেশ বা রমা তাদের কোনো ক্ষতি করেনি, বরং গ্রামের ভালো করতে চেয়েছিল; কিন্তু নিজেদের সংকীর্ণতা ও অন্যের ভালো সহ্য করতে না পারার ব্যাধি থেকে তারা সমাজকে ব্যবহার করে রমা ও রমেশের পবিত্র সম্পর্ককে কলঙ্কিত করতে কুৎসার এক জটিল জাল বুনেছিল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ বা ‘গণদেবতা’ উপন্যাসেও চণ্ডীমণ্ডপের আড্ডায় বসা কিছু পরচর্চাকারী চরিত্রের দেখা মেলে যাদের নিজের জীবনের কোনো লক্ষ্য নেই, কিন্তু অন্যের হাঁড়ির খবর নেওয়া এবং তিলকে তাল করে কুৎসা রটনাই ছিল প্রধান কাজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প ‘ল্যাবরেটরি’-তেও দেখা যায় সমাজের তথাকথিত হিতৈষী ও সম্পর্কহীন মানুষজন অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসা রটাতে কতটা উন্মুখ হয়ে থাকে।
অতীতে যে কুৎসা রটনা সীমাবদ্ধ ছিল পাড়ার চায়ের দোকানে, চণ্ডীমণ্ডপে কিংবা অন্দরমহলের ফিসফিসানিতে, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তা এক ভয়াবহ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া এখন এই অকারণে কুৎসা রটনার সবচেয়ে বড় প্রজনন ক্ষেত্র। ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্স (সাবেক টুইটার)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আজ কুৎসা রটনাকারীদের হাতে তুলে দিয়েছে এক অদৃশ্য ঢাল, যার নাম ছদ্মনাম বা ভুয়া পরিচয়। পর্দার ওপারে বসে, নিজের পরিচয় লুকিয়ে, সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা একজন মানুষের চরিত্র হনন করা এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। একেই আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন কিবোর্ড ওয়ারিয়রদের ট্রোলিং ব্যাধি। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার আর সস্তা প্রচারের লোভে মানুষ আজ অন্যের ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমুখে ব্যবচ্ছেদ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না।
অনেকে এটাকে ভিডিও বা কনটেন্ট মনিটাইজেশনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের একটা উপায় হিসেবেই গ্রহণ করেছে। সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম বা গাণিতিক পদ্ধতিও অদ্ভুতভাবে নেতিবাচকতাকে এবং মানুষের আদিম কুৎসা শোনার প্রবৃত্তিটিকে বেশি ছড়িয়ে দেয়। বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন তথাকথিত সামাজিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার কীভাবে সারাক্ষণ ঘৃণা, কুৎসা, অশ্লীল গালিগালাজ এবং উস্কানি ছড়িয়ে সমাজকে দূষিত করছে, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিলক্ষিত হয়েছে। এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় মানুষ আজ একে অপরকে চেনে না, কিন্তু একে অপরের দিকে বিষাক্ত কাদা ছুঁড়তে বিন্দুমাত্র ভাবছে না। এটি কেবল কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করছে না, বরং পুরো মানব সমাজকে এক চরম সহানুভূতিহীন নিষ্ঠুর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কুৎসা রটনার বিষয়ে প্রচলিত প্রায় সব ধর্মেই সতর্কতা ও সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপিত আছে। পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ধর্মেই কুৎসা রটনা ও পরنিন্দাকে অনৈতিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে ক্ষতিকর পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ইসলাম ধর্ম: ইসলাম ধর্মে কুৎসা রটনাকে (গীবত) নিজের মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো জঘন্য কাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে (সূরা: হুজুরাত, আয়াত ১২)। বিনা প্রমাণে সতী নারীর বিরুদ্ধে অপবাদের শাস্তি হিসেবে আশিটি বেত্রাঘাতের বিধান রয়েছে। ইসলামে কুৎসা রটনা যেমন অপরাধ, তা চুপচাপ শোনাও সমান অপরাধের শামিল।
হিন্দু ধর্ম: হিন্দু ধর্মে একে একটি মহাপাপ ও তামসিক গুণ বলা হয়েছে। কুৎসা রটালে মানুষের নিজের পুণ্য ক্ষয় হয় এবং কর্মফলের নিয়ম অনুযায়ী রটনাকারীকে পরবর্তীতে দুঃখ ও দুর্গতি পোহাতে হয়।
খ্রিষ্ট ধর্ম: খ্রিষ্ট ধর্মে দশ আজ্ঞার অন্যতম একটি হলো “মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়া”। নিউ টেস্টামেন্টে জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, কুৎসা রটনা পুরো জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
বৌদ্ধ ধর্ম: বুদ্ধের আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অন্যতম স্তম্ভ হলো সম্যক বাক্য, যা পরনিন্দা, মিথ্যা ও কঠোর শব্দ বর্জন করে কেবল সত্য ও কল্যাণকর কথা বলতে শেখায়। বুদ্ধের উপদেশ হলো, অন্যের মিথ্যা নিন্দা বা কুৎসায় উথাল-পাতাল না হয়ে চিত্তকে শান্ত রাখা উচিত।
প্রাচীন রোমান আইন, মধ্যযুগীয় ইংরেজি সাধারণ আইন এবং প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে (যেমন: কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র) সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে কুৎসাকারীদের কঠোর শারীরিক ও আর্থিক শাস্তির বিধান ছিল। বাংলাদেশে কার্যকর দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা রটনা ও মানহানি দণ্ডনীয় অপরাধ। দণ্ডবিধির ৫০১ ও ৫০২ ধারাতে মানহানিকর কুৎসা রটনাকারীদের সহযোগীদেরও শাস্তির বিধান আছে। ইদানিং কালের সাইবার আইনেও ডিজিটাল মাধ্যমে কুৎসা রটনাকে মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। তবে ধর্মীয় বিধি-নিষেধ এবং আইনী কঠোরতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক সময় বিভিন্ন ধর্মীয় বক্তা ও গুরুদেরকেও নিজের মতাদর্শের বাইরের লোকদের ব্যাপারে কঠোর নিন্দা এবং কুৎসা রটনা করতে দেখা যায়। একই অবস্থা রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেখানে পারস্পরিক রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা একটি দৈনন্দিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
| ধারার উৎস / মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব | মূল বিষয়বস্তু ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা | আইনী প্রতিকার ও শাস্তি |
| ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব (প্রোজেকশন) | নিজের অবদমিত অনৈতিক ইচ্ছা ও হীনমন্যতা অন্যের চরিত্রের ওপর জোরপূর্বক আরোপ করা। | মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির বহিঃপ্রকাশ ও আত্মরক্ষামূলক অলীক পবিত্রতা খোঁজার চেষ্টা। |
| জাক লাকার তত্ত্ব (দর্পণ পর্যায়) | অন্যের পূর্ণতা বা সুখ দেখে নিজের ভেতরের অসম্পূর্ণতার দাহ থেকে হিংস্র ভাষার ব্যবহার। | অন্যের সুখ ও আনন্দকে ধুলিস্যাৎ করার অপচেষ্টা। |
| ফ্রিডরিখ নিৎশের দর্শন | রিসেনটিমেন্ট বা নিজের অক্ষমতার কারণে অন্যের শ্রেষ্ঠত্বকে অন্যায় বলে প্রচার করার দাস-মানসিকতা। | অস্তিত্বের চরম শূন্যতা থেকে অন্যের জীবনকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা। |
| বাংলাদেশ দণ্ডবিধি (৪৯৯ ও ৫০০ ধারা) | যেকোনো ধরনের মিথ্যা অপবাদ, মানহানিকর বক্তব্য প্রদান বা কুৎসা রটনা। | আইনগতভাবে এটি একটি মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এর জন্য কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। |
| বাংলাদেশ দণ্ডবিধি (৫০১ ও ৫০২ ধারা) | মানহানিকর কুৎসা রটনার কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করা কিংবা তা প্রকাশ করা। | কুৎসা রটনাকারীদের সহযোগীদের জন্য সমমানের শাস্তির আইনগত ব্যবস্থা। |
| ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইন | ইন্টারনেট, সামাজিক মাধ্যম বা যেকোনো ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া পরিচয় বা ছদ্মনামে কুৎসা ও ট্রোলিং। | আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এটিকে অ-জামিনযোগ্য ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। |
পরিশেষে বলা যায়, অকারণে কুৎসা রটনা যিনি করেন, ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত তারই বেশি হয়। প্রবাদে যেমন বলা হয়, অন্যের দিকে কাদা ছুঁড়লে নিজের হাতটাই আগে নোংরা হয়। যে মানুষটি কুৎসা রটাচ্ছে, সে আসলে নিজের মনের নোংরা আয়নাটিকেই পৃথিবীর সামনে মেলে ধরছে। এটি একটি মারাত্মক আত্মঘাতী প্রবৃত্তি। সম্পর্কহীন মানুষের এই বিষোদ্গার আসলে তাদের নিজেদের আত্মার আর্তনাদ, যা শুদ্ধতার আলো ও সৌন্দর্যের উপস্থিতি সহ্য করতে পারে না। আলোর মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস যাদের নেই, তারাই অন্ধকারের আড়ালে বসে কুৎসার জাল বোনে। এই মানসিক ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে কেবল কুৎসাকারীকে প্রতিহত করাই যথেষ্ট নয়, বরং কুৎসার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই মনস্তাত্ত্বিক অন্ধকারকে চেনা এবং সামাজিকভাবে তা বর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। মানুষের মন যখন নিজের সৃজনশীলতায় মগ্ন হবে, তখনই কেবল অন্যের আলোর প্রতি এই অন্ধ আক্রোশের অবসান ঘটবে।
অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য