দেশে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়েই রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মৃতদের মধ্যে চারজনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৭৩৩ জন রোগী। সর্বশেষ এই চিত্র ইঙ্গিত করছে, সংক্রমণের গতি কিছুটা ওঠানামা করলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বুধবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার হালনাগাদ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, নতুন আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ধারাবাহিকতা এবং মৃত্যুর ঘটনা এখনো উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৬ জনে। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া মৃত্যুর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুটি হিসাব আলাদাভাবে প্রকাশ করে। কারণ, হামের উপসর্গ থাকলেও সব ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আবার অনেক রোগীর মৃত্যুর পেছনে অন্য জটিলতাও ভূমিকা রাখতে পারে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন। রোগটির সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি, টিকা না নেওয়া মানুষ এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ কিংবা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্ধারিত বয়সে হাম প্রতিরোধী টিকা নিশ্চিত করা হলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ-নাক ঢেকে রাখা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি বা হামের অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিজে থেকে ওষুধ সেবন বা চিকিৎসা বিলম্বিত করলে জটিলতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিভাবকদের প্রতি শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে। পাশাপাশি জ্বর, ফুসকুড়ি বা হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট, দেশে হামের প্রকোপ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং টিকাদান কর্মসূচিতে সর্বস্তরের অংশগ্রহণই সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।









