নোয়াখালী জেলা কারাগার ফটক চত্বরে এক ব্যতিক্রমী ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় রোববার বিকেলে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে জামিনে মুক্তির পর ফুল দিয়ে বরণ করতে গিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন দলটির চার সক্রিয় কর্মী। কারাগারের সামনে এই শোডাউন ও বরণের প্রস্তুতির সময় তাদের কাছ থেকে এক ব্যাগ ভর্তি তাজা ফুলের মালা জব্দ করেছে পুলিশ।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল পাঁচটার দিকে নোয়াখালী জেলা কারাগারের প্রধান ফটকের সামনে এই অভিযান পরিচালিত হয়। আটক হওয়া চারজনকে সুধারাম মডেল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৫ জুন জুমার নামাজ শেষে জেলার সদর উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের বাঁধের হাট বাজারে একটি ঝটিকা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইউনিয়ন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে প্রায় তিন হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন বলে তথ্য রয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকেই পুরো নোয়াখালী সদর উপজেলায় রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা বিরাজ করতে শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ পরবর্তীতে জোরালো অভিযান পরিচালনা করে। ওই সময় বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, রোববারের ওই ঘটনার মূল সূত্রপাত হয়েছিল দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ধরে কারাগারে থাকা বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর জামিন পাওয়ার খবরকে কেন্দ্র করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে রোববার বিকেলে তাদের একটি বড় অংশ জামিনে মুক্তি পান। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই কারাগারের আশপাশের এলাকায় নানা গুঞ্জন শুরু হয়। কারামুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের লোকজনের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে দলটির অনেক নেতাকর্মী সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করেন।
পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিল গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনী। কারামুক্তদের বরণ করার নামে একটি শোডাউন করার পরিকল্পনা ছিল উপস্থিত নেতাকর্মীদের। তাদের হাতে ছিল এক ব্যাগ ভর্তি ফুলের মালা, যা দিয়ে কারাগার থেকে বের হওয়া বন্দীদের গলায় পরানোর প্রস্তুতি চলছিল। তবে পুলিশ সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সন্দেহভাজন হিসেবে চারজনকে আটক করে।
আটককৃত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তারা হলেন— সদর উপজেলার এওজবালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম এওজবালিয়া গ্রামের মৃত শফি উল্যার ছেলে ছেরাজল হক চৌধুরী (৬৩), একই গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে মেহেদী হাসান হৃদয় (২০), মো. বাহারের ছেলে মো. ফারুক হোসেন (১৮) এবং মো. খোকনের ছেলে মো. নাজিম (১৮)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে যে তারা সবাই সরাসরি আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
এ বিষয়ে সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো আসামি জামিনে মুক্তি পেলে তার পরিবারের স্বজনেরা একটি কিংবা দুটি ফুলের মালা নিয়ে আসতেই পারেন, যা মানবিক ও স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আটক হওয়া এই ব্যক্তিরা কোনো সাধারণ স্বজন ছিলেন না। তাদের কাছে ছিল পুরো এক ব্যাগভর্তি ফুলের মালা। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে কারাগারের সামনে দলবদ্ধ হয়ে ছবি তুলে একটি শোডাউন করার পাঁয়তারা করছিলেন, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারত।
ওসি আরও জানান, এই সংগঠনের পক্ষে এমন রাজনৈতিক তৎপরতা বা শোডাউন করার কোনো সুযোগ নেই। এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। ওই মামলায় এই চারজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোমবার সকালে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। এই ঘটনার পর থেকে জেলা কারাগার ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে পুনরায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে না পারে।
মন্তব্য