সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে চলতি বছরে বিভাগটিতে হামের উপসর্গ ও পরীক্ষায় নিশ্চিত সংক্রমণ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৭ জনে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। মারা যাওয়া দুই শিশু হলো তাসপিয়া ও হামিদুল। তাদের দুজনেরই বয়স দেড় বছরের নিচে। বয়স কম হওয়ায় হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শারীরিক অবনতি এবং জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করে থাকেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩০৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন করে ২৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৩২ জন সন্দেহভাজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি—দুই ক্ষেত্রেই নতুন সংক্রমণের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
চলতি বছরের শুরু থেকেই সিলেট বিভাগে শিশুদের মধ্যে হাম এবং হামের মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অল্পবয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হাসপাতালগুলোতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ বছরের পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৮৫২ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে সব রোগীর সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়নি। ফলে মৃত্যুর সামগ্রিক হিসাবের মধ্যে নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গ থাকা সন্দেহভাজন রোগী—দুই ধরনের ঘটনাই রয়েছে।
এ পর্যন্ত ১২৭ জনের মৃত্যুর মধ্যে মাত্র ছয়জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছিল। বাকি মৃত্যুগুলোর ক্ষেত্রে রোগীদের হামের উপসর্গ ছিল, কিন্তু পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই ১২৭ জনের পুরো সংখ্যাটিকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের কারণে মৃত্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত একটি রোগ। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। শিশু দুর্বল থাকলে বা রোগের জটিলতা তৈরি হলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের অন্য শিশুদের থেকে পৃথক রাখা জরুরি। পাশাপাশি টিকাদানের আওতা বাড়ানো এবং যেসব শিশু টিকার বাইরে রয়েছে, তাদের দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসকেরা অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। শিশুর জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর বা মৌসুমি অসুস্থতা হিসেবে উপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সিলেটের হাসপাতালগুলোতে নতুন রোগী ভর্তি ও পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ শনাক্তের ঘটনা অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। বিশেষ করে কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার এবং মৃত্যুর ঘটনাগুলো সামনে রেখে দ্রুত শনাক্তকরণ, যথাযথ চিকিৎসা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা জোরদার করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।









