নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তানজিনা আক্তারের (১৭) মৃত্যুকে ঘিরে সৃষ্ট অস্পষ্টতা দূর হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বজ্রপাতের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে মৃত্যুর কথা প্রচার করা হলেও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে যে, এটি ছিল প্রকৃতপক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুরে চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন।
Table of Contents
ঘটনার আদি বিবরণ ও পারিবারিক দাবি
মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে সুবর্ণচর উপজেলার চরআমানউল্যাহ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত তানজিনা আক্তার ওই এলাকার বাসিন্দা শেখ মুজাম সেন্টুর মেয়ে।
ঘটনার পরপরই তানজিনার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, সকালে বৃষ্টির সময় বাড়ির অত্যন্ত কাছে একটি বজ্রপাত হয়। তাদের দাবি অনুযায়ী, বজ্রপাতের প্রচণ্ড শব্দে তানজিনা নিজ ঘরেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তাৎক্ষণিক হৃদরোগে আক্রান্ত (স্ট্রোক) হয়ে মারা যান। এই তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও জনমানসে শুরুতে এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মৃত্যু হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের অনুসন্ধান ও রহস্য উদ্ঘাটন
মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর চরজব্বর থানার একটি আলামত সংগ্রহকারী দল নিয়ে ওসি মো. লুৎফর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সুরতহাল ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সময় পুলিশের কাছে পরিবারের দাবিটি ভিত্তিহীন বলে মনে হয়।
ওসি লুৎফর রহমান জানান:
“ঘটনাস্থলে বজ্রপাতে মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট আলামত, যেমন দহন চিহ্ন বা পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়নি। বরং নিবিড় পর্যবেক্ষণে নিহতের গলায় ফাঁসের চিহ্ন স্পষ্ট হয়।”
পুলিশি তদন্তে প্রকাশ পায় যে, তানজিনা নিজ ঘরেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের আইনি জটিলতা এবং সামাজিক লোকলজ্জার আশঙ্কায় পরিবারের সদস্যরা আত্মহত্যার ঘটনাটি গোপন রাখার চেষ্টা করেছিলেন। বজ্রপাতের তীব্র শব্দকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়।
মেধাবী শিক্ষার্থী তানজিনার পরিচয়
তানজিনা আক্তার সুবর্ণচর উপজেলার একজন অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি স্থানীয় ইসমাইলিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে তাঁর রেকর্ড ছিল ঈর্ষণীয়। গত বছর অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষায় পুরো সুবর্ণচর উপজেলা থেকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে মাত্র দুইজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছিলেন, তানজিনা ছিলেন তাঁদের একজন। তাঁর এমন অকাল ও অস্বাভাবিক মৃত্যুতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সহপাঠীদের মধ্যে শোকের গভীর ছায়া নেমে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনি পদক্ষেপ
পুলিশ তানজিনার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে বর্তমান আলামতের ভিত্তিতে পুলিশ বিষয়টিকে ‘আত্মহত্যা’ হিসেবেই গণ্য করছে।
চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ লুৎফর রহমান আরও জানান:
এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মেধাবী এই শিক্ষার্থী কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন কিংবা এর পেছনে অন্য কোনো প্রভাব বা প্ররোচনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ কাজ করছে।
আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন কোনো অপমৃত্যুর ঘটনায় বিভ্রান্তিকর তথ্য না ছড়িয়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করা হয়। একটি সম্ভাবনাময় প্রাণের এই বিয়োগান্তক পরিণতির প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
