ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসে যে কজন মহান মানুষ তাঁদের অনন্য প্রজ্ঞা, অসীম ত্যাগ, গভীর দেশপ্রেম এবং অনুপম মানবিকতার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রখ্যাত ব্যারিস্টার, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ, বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী, সমাজসংস্কারক, সংবেদনশীল কবি, লেখক এবং সর্বজনীন জননেতা। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এক অনন্য ও অনুপ্রেরণাদায়ী সাধনা।
আইনজীবী হিসেবে তাঁর পেশাগত খ্যাতি ছিল কিংবদন্তিতুল্য। বিশেষ করে ১৯০৮ সালের ঐতিহাসিক আলিপুর বোমা মামলায় তিনি ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে আইনি লড়াই লড়েন। সেখানে তিনি অসাধারণ যুক্তি, আইনি প্রজ্ঞা এবং বাগ্মিতার মাধ্যমে অরবিন্দ ঘোষকে বেকসুর খালাস করিয়ে আনতে সক্ষম হন। এই ঐতিহাসিক মামলাটি তাঁকে সমগ্র ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যারিস্টার হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
রাজনীতিতেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য ও অবিস্মরণীয়। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯২২ সালে গয়া কংগ্রেস অধিবেশনে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে তিনি সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর তিনি পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর সাথে যৌথভাবে স্বরাজ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য থেকেই আরও বেশি কার্যকর ও গতিশীল করা।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্মের বিবরণী
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের জীবনাবসান, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং সাহিত্যিক অবদানের প্রধান তথ্যাদি নিচে ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| নির্দিষ্ট বিষয়সমূহ | জীবন ও কর্মের ঐতিহাসিক তথ্যাদি |
| জন্ম তারিখ ও স্থান | ১৮৭০ সালের ৫ই নভেম্বর, তেলিরবাগ গ্রাম, মুন্সিগঞ্জ (তৎকালীন বিক্রমপুর, বাংলাদেশ)। |
| আলিপুর বোমা মামলা | ১৯০৮ সালে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে লড়াই করে তাঁকে খালাস প্রদান। |
| স্বরাজ পার্টি গঠন | ১৯২২ সালে গয়া কংগ্রেসের সভাপতির পদ ত্যাগ করে নতুন দল প্রতিষ্ঠা। |
| কলকাতার প্রথম নির্বাচিত মেয়র | ১৯২৪ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের শীর্ষ পদে দায়িত্ব গ্রহণ। |
| সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা | ‘নারায়ণ’ নামক সমকালীন সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার বিখ্যাত সাময়িকী। |
| মৃত্যু তারিখ ও স্থান | ১৯২৫ সালের ১৬ই জুন, দার্জিলিং (মাত্র ৫৫ বছর বয়সে)। |
স্বদেশি চেতনা ও আধুনিক নগর প্রশাসনের ভিত্তি নির্মাণ
স্বদেশি চেতনার প্রতি চিত্তরঞ্জন দাসের অঙ্গীকার ছিল সম্পূর্ণ অকৃত্রিম ও নিরেট। অসহযোগ আন্দোলনে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার পর তিনি সমস্ত পশ্চিমা ও বিদেশি পোশাক সম্পূর্ণ বর্জন করেন। এরপর থেকে তিনি আমৃত্যু দেশীয় খদ্দরের ধুতি ও পাঞ্জাবি পরিধান করতেন। ব্যক্তিগত জীবনের সকল প্রকার রাজকীয় বিলাসিতা ও বৈভব ত্যাগ করে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ব্যারিস্টারি পেশা থেকে অর্জিত তাঁর বিপুল উপার্জনের একটি বিশাল অংশ তিনি ভারতের জাতীয় আন্দোলন, সাধারণ মানুষের শিক্ষা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে অকাতরে দান করে যান। তাঁর এই মহানুভবতার কারণেই দেশবাসী তাঁকে ‘দেশবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯২৪ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মেয়র হিসেবে তিনি আধুনিক নগর প্রশাসনের মজবুত ভিত্তি নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কলকাতার সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক সেবা, জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ও সার্বিক পৌর পরিচালনায় তিনি এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন।
সাহিত্যপ্রেমী চিত্তরঞ্জন দাস কেবল রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচ্চমানের কবি ও প্রাবন্ধিক। তাঁর সুনিপুণ সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকা ‘নারায়ণ’। সমকালীন সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্ত চিন্তাচর্চার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই পত্রিকাটি। বিভিন্ন ভিন্নধর্মী মত ও স্বাধীন চিন্তার অবাধ প্রকাশের সুযোগ থাকার কারণে পত্রিকাটি তৎকালীন সুধীসমাজে ও সাহিত্যাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
আজ ১৬ই জুন, এই মহান নেতার ১০১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯২৫ সালের এই দিনে দার্জিলিংয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই মহাপ্রয়াণে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।” এই কালজয়ী দুটি পঙ্ক্তিই মূলত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সমগ্র জীবনের শ্রেষ্ঠ ও সার্থক পরিচয় বহন করে।
