রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনার জেরে মৃত রোগীর মরদেহ ঘিরে তীব্র উত্তেজনা, বিক্ষোভ এবং কর্মবিরতির পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস করিয়ে ক্ষমা প্রার্থনায় বাধ্য করার ঘটনা ঘটলেও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেননি। ফলে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে শনিবার ভোরে, নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার নূরনাহার বেগম নামে এক নারী রোগীকে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করার পরপরই তার মৃত্যু হলে। রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনরা চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তোলেন। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে মৃত নারীর ছোট ছেলে রিফাত হোসেন কর্তব্যরত দুই চিকিৎসকের ওপর শারীরিকভাবে হামলা চালান বলে অভিযোগ ওঠে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা একযোগে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ করে দেন। পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও মরদেহ হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয়। আন্দোলনরত চিকিৎসকরা মরদেহ আটকে রেখে অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।
পরবর্তীতে প্রশাসনিক উদ্যোগে রিফাত হোসেনকে হাসপাতালে ডেকে আনা হয়। হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়ে তাকে কান ধরে উঠবস করিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করানো হয়। এরপরই মৃতদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তবে এই ঘটনার পরও রোববার সকাল থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি শুরু করেন। একইসঙ্গে কলেজের শিক্ষার্থীরাও ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেন। এতে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবায় তীব্র সংকট দেখা দেয়। বহির্বিভাগে রোগীর দীর্ঘ সারি তৈরি হলেও চিকিৎসা না পেয়ে অনেকেই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, জরুরি সেবা চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন। সাধারণ রোগীদের পাশাপাশি ভর্তি রোগীরাও পর্যাপ্ত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একজন রোগীর স্বজন জানান, চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে অনেককে বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা দাবি করছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানান তারা।
ইন্টার্ন চিকিৎসক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তবে হাসপাতাল প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে স্বাভাবিক সেবা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঘটনার সময়রেখা
| সময়কাল | ঘটনার বিবরণ |
|---|---|
| শনিবার ভোর | রোগী ভর্তি, কিছু সময় পর মৃত্যু |
| শনিবার সকাল | চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, চিকিৎসকের ওপর হামলা |
| শনিবার দুপুর | জরুরি বিভাগের কার্যক্রম আংশিক বন্ধ, পরে সীমিতভাবে চালু |
| দুপুর পরবর্তী সময় | মরদেহ আটকে বিক্ষোভ ও দাবি উত্থাপন |
| পরবর্তীতে | অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ডেকে এনে প্রকাশ্যে ক্ষমা আদায় |
| রোববার সকাল | ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি শুরু |
বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসপাতালজুড়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে এবং রোগীসেবা স্বাভাবিক করতে প্রশাসনের উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
