হামের যমজ শিশু মৃত্যু মিরসরাইয়ে শোক

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া তাকিয়াপাড়া এলাকায় ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ও বেদনাবিধুর ঘটনা। হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে প্রাণ হারিয়েছে এক বছরের যমজ দুই শিশু। এই অকাল মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া, আর সন্তান হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েছেন তাদের বাবা হারুনুর রশিদ।

পরিবারের সদস্যরা জানান, হারুনুর রশিদ ও তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান দম্পতির ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় যমজ দুই পুত্রসন্তান—আবদুল্লাহ আল ফাহিম ও আবদুল্লাহ আল নোমান। গত বছরের ১৬ এপ্রিল জন্ম নেওয়া এই দুই শিশুর সঙ্গে ছিল আরও একটি ছয় বছর বয়সী কন্যাসন্তান। পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও হঠাৎ করেই নেমে আসে বিপর্যয়।

চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রথমে ফাহিমের শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৮ মার্চ তার শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। কিছুটা উন্নতি হলে তাকে বাড়িতে আনা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তার অবস্থার আবার অবনতি ঘটে।

অন্যদিকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে যমজ ভাই নোমানের শরীরেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। তাকেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকরা তার শরীরেও হামের সংক্রমণ নিশ্চিত করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ মে নোমানের মৃত্যু হয়।

এর আগে ফাহিমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। তবে সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের শয্যা সংকট থাকায় তাকে নারায়ণগঞ্জের একটি শিশু চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তিনিও জীবনযুদ্ধে হার মানেন।

সন্তানদের বাঁচাতে গিয়ে হারুনুর রশিদকে ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় ছয় লাখ টাকা, যা তিনি আত্মীয়স্বজন, বন্ধু এবং বিভিন্ন সংস্থা থেকে ধার করে জোগাড় করেন। চিকিৎসার সময় তিনি নিজের ছোট ব্যবসাও বন্ধ রাখতে বাধ্য হন। এখন তিনি একই সঙ্গে আর্থিক ঋণের বোঝা এবং অপার শোক বহন করছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই শিশুই ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত, হাসিখুশি ও সবার প্রিয়। তাদের অকাল মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশীরা বারবার আসছেন শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে।

ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত সময়ক্রম নিচে উপস্থাপন করা হলো—

সময়/তারিখঘটনার বিবরণ
১৬ এপ্রিল (গত বছর)যমজ ফাহিম ও নোমানের জন্ম
৮ মার্চফাহিমের শ্বাসকষ্ট শুরু
১৮ মার্চফাহিমের হামের সংক্রমণ শনাক্ত
২৫ মার্চফাহিমকে বাড়িতে আনা হয়
এপ্রিল মাঝামাঝিনোমানের শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়
২২ মেনোমানের মৃত্যু
পরবর্তী সময়ফাহিমের ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে চিকিৎসা
সাম্প্রতিকফাহিমের মৃত্যু

এই করুণ ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং সমাজের জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা। সময়মতো চিকিৎসা, সচেতনতা এবং শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষার অভাব কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এই ঘটনা তা আবারও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।