ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় চাঞ্চল্যকর ও রহস্যে ঘেরা অর্ধপোড়া এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। স্বর্ণের কলসি ও অলৌকিক গুপ্তধনের প্রলোভন দেখিয়ে নাসিমা নামের এক গৃহবধূকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার অভিযোগে সামশুল হক নামের এক তান্ত্রিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২ জুন, ২০২৬) রাত সাড়ে ৮টায় ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশের পক্ষে সার্বিক বিষয়বস্তু তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন।
Table of Contents
পরিচয় ও মরদেহ উদ্ধারের বিবরণ
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত অভিযুক্ত তান্ত্রিক সামশুল হক হরিপুর উপজেলার টেঙরিয়া মকবুলপাড়া গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে। অন্যদিকে, নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া নিহত গৃহবধূ নাসিমা আক্তার জেলার রানীশংকৈল উপজেলার রাউতনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য আব্দুল্লাহর স্ত্রী।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত সোমবার (১ জুন, ২০২৬) সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে হরিপুর উপজেলার ভাতুড়িয়া এলাকার একটি নির্জন ও ঝোপঝাড়পূর্ণ স্থানে স্থানীয় বাসিন্দারা অর্ধদগ্ধ বা আংশিক পোড়া অবস্থায় এক নারীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে হরিপুর থানা পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন।
খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় পুলিশ মরদেহের গলায় রশির গভীর দাগ, শরীরের পেছনের অংশে গুরুতর পোড়ার চিহ্ন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় নিহতের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তদন্ত প্রক্রিয়া ও প্রযুক্তির ব্যবহার
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেনের সার্বিক দিকনির্দেশনায় জেলা পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম এই হত্যাকাণ্ডের ক্লু খোঁজার জন্য একযোগে তদন্তে নামে। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে নিহতের ১২ বছর বয়সী শিশুকন্যার দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য, নিহতের ব্যক্তিগত অর্থ লেনদেনের সূত্র এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও কল রেকর্ড পর্যালোচনার মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচে থাকা অলৌকিক স্বর্ণের কলসি এবং মূল্যবান স্বর্ণের পুতুল পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সরলমনা গৃহবধূ নাসিমার কাছ থেকে বিভিন্ন দফায় মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলেন পেশাদার প্রতারক ও তান্ত্রিক সামশুল হক।
জেলা পুলিশের ভাষ্য: অভিযুক্ত সামশুল হক দীর্ঘদিন ধরে অলৌকিক ক্ষমতা, জিন-পরীর আছর ও গুপ্তধনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ ও সরলমনা মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিলেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে এমন একাধিক প্রতারণামূলক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সত্যতা পাওয়া গেছে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ও আলামত নষ্টের চেষ্টা
পুলিশি তদন্ত ও আসামির স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে যে, ঘটনার দিন নিহত নাসিমা আক্তার তান্ত্রিক সামশুল হককে তার প্রতিশ্রুত গুপ্তধনের স্বর্ণ এনে দেওয়ার জন্য তীব্র চাপ প্রয়োগ করেন। অন্যথায় তার দেওয়া পূর্বের টাকা ফেরত চান। এমতাবস্থায় প্রতারণার বিষয়টি ফাঁস হওয়ার ভয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে নাসিমাকে একটি নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে যান অভিযুক্ত তান্ত্রিক।
সেখানে গুপ্তধন প্রাপ্তির বিশেষ तंत्र বা তন্ত্র-মন্ত্রের আচার ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের কথা বলে নাসিমার চোখ বন্ধ করিয়ে তার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে সজোরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন সামশুল হক। শ্বাসরোধের ফলে নাসিমার মৃত্যু নিশ্চিত হলে ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার এবং মামলার আলামত সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নাসিমার পরিহিত বোরখায় আগুন ধরিয়ে দেন ওই তান্ত্রিক। তবে আগুন সম্পূর্ণভাবে শরীরেClarification ছড়িয়ে পড়ার আগেই বাতাসে বা অন্য কোনো কারণে নিভে যায়। যার ফলে মরদেহের পেছনের অংশে কেবল দগ্ধ হওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন অবশিষ্ট রয়ে যায়।
আসামির স্বীকারোক্তি ও উদ্ধারকৃত আলামত
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন যে, ঘটনার দিনই বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত সামশুল হককে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন।
উদ্ধারকৃত অর্থ: নিহতের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া নগদ ৩০ হাজার টাকা উদ্ধার।
আলামত: আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন অপরাধের সামগ্রী উদ্ধার।
আইনি পদক্ষেপ: আসামি বিজ্ঞ আদালতে হাজির হয়ে নিজের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনি প্রক্রিয়া
পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় সম্পূর্ণ ক্লুলেস বা সূত্রহীন অবস্থায় শুরু হওয়া এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল রহস্য ও প্রধান আসামিকে মাত্র ২০ ঘণ্টার এক ম্যারাথন অভিযানের মধ্যে উদ্ঘাটন ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত তান্ত্রিক সামশুল হক ইতিমধ্যেই বিজ্ঞ আদালতে হাজির হয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা অনুযায়ী নিজের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।
এদিকে, হরিপুর উপজেলার ভাতুড়িয়া এলাকায় সংঘটিত এই নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তান্ত্রিকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, তান্ত্রিকের সহযোগী কিংবা অন্য কোনো বড় ধরনের আন্তঃজেলা প্রতারক চক্র জড়িত আছে কি না, সে বিষয়েও জেলা পুলিশের গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
