হামে ৬৮ দিনে প্রাণ হারাল ৪৯৯ শিশু

দেশে হাম ও হামের উপসর্গজনিত শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। সরকার হাম প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানালেও টিকাদান কর্মসূচির বাইরে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বড় পরিসরের কার্যকর ব্যবস্থা এখনও দৃশ্যমান হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট বিভাগেই মারা গেছে পাঁচ শিশু। এ নিয়ে গত ৬৮ দিনে হাম ও এর জটিলতায় মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯৯ জনে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে টিকা উৎপাদন ও আক্রান্ত শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ওপর নির্ভর করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, পৃথক চিকিৎসা ইউনিট চালু এবং পুষ্টিহীন শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তা জরুরি।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হামের সংক্রমণ বাড়লেও বাংলাদেশে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতিকে জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি টিকা ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য অনিয়ম তদন্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, নতুন আইসিইউ স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১১ শিশুর মধ্যে নয়জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং দুজন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এখন পর্যন্ত মোট ৪৯৯ মৃত্যুর মধ্যে ৪১৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৮৫ জন সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

হাম পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ

সূচকসংখ্যা
গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু১১
মোট মৃত্যু৪৯৯
হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু৪১৪
হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু৮৫
গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ শনাক্ত১,২৬১
১৫ মার্চ থেকে উপসর্গ শনাক্ত৬০,৫৪০
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন হাম শনাক্ত৫৪
মোট হাম শনাক্ত৮,৩২৯
হাসপাতালে ভর্তি৪৭,৫১১
সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ৪৩,৪১১

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৬০ হাজার ৫৪০ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। একই সময়ে ৮ হাজার ৩২৯ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৪৭ হাজার ৫১১ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তাদের মধ্যে ৪৩ হাজার ৪১১ শিশু চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে অন্তত ১৮ শতাংশ শিশু এখনও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। গত চার বছরে বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং গত বছর ভিটামিন-এ কর্মসূচি বন্ধ থাকাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের বিক্ষোভ সমাবেশে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রীয়ভাবে টিকা উৎপাদন এবং হামে আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসার দাবি জানানো হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক ফয়জুল হাকিম বলেন, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল থেকে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও শুরুতে পরিস্থিতি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তিনি কভিড-১৯ সময় টিকা ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত ও শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবিও জানান।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, একজন হাম আক্রান্ত রোগী আরও ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হামে আক্রান্ত শিশুর রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দ্রুত দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুরা একাধিক রোগে ভুগছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, হাম শনাক্ত হওয়ার পরপরই জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। ঈদের পর আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে বলে জানান তিনি। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশে হামের টিকা সরবরাহ না থাকায় অনেক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতি সেই সংকটের প্রভাব বলে তিনি উল্লেখ করেন।