গাজীপুর জেলায় মাত্র দুই রাতের ব্যবধানে দুটি পৃথক ও নৃশংস ঘটনায় মোট আটজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কাপাসিয়া উপজেলায় একই পরিবারের পাঁচজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা এবং কালিয়াকৈর উপজেলায় গরু চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই সিরিজ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সমগ্র জেলাজুড়ে চরম চাঞ্চল্য ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
Table of Contents
কাপাসিয়ায় পারিবারিক কলহে একই পরিবারের ৫ জন খুন
গত শুক্রবার দিবাগত রাতে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘাতক ফোরকান মিয়া তার স্ত্রী, তিন সন্তান এবং শ্যালককে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। শনিবার সকালে প্রবাসী মনির হোসেনের মালিকানাধীন একটি বাড়ি থেকে পুলিশ রক্তাক্ত অবস্থায় পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহতদের পরিচয়:
১. শারমিন খানম (৩০) – ঘাতকের স্ত্রী।
২. মীম খানম (১৫) – বড় মেয়ে।
৩. উম্মে হাবিবা (৮) – মেজো মেয়ে।
৪. ফারিয়া (২) – ছোট মেয়ে।
৫. রসুল মিয়া (২২) – শারমিনের ছোট ভাই।
পেশায় প্রাইভেটকার চালক ফোরকান মিয়া ওই বাড়িতে প্রায় এক বছর ধরে ভাড়া থাকতেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ ও আর্থিক লেনদেন কেন্দ্রিক সমস্যার কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ফোরকানের লেখা একটি কম্পিউটার টাইপকৃত ডায়েরি উদ্ধার করেছে, যেখানে তিনি তার স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনেন। কাপাসিয়া থানার ওসি শাহীনুর আলম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান মিয়া জানান, অভিযুক্ত ফোরকানকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
কালিয়াকৈরে গণপিটুনিতে ৩ জনের মৃত্যু
কাপাসিয়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রোববার ভোরে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাঘচালা গ্রামে আরেকটি সহিংস ঘটনা ঘটে। গরু চুরির অভিযোগে গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে তিন সন্দেহভাজন চোর নিহত হয়। উত্তেজিত জনতা এ সময় চোরদের ব্যবহৃত একটি ট্রাকও অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত কয়েক মাস ধরে ওই এলাকায় গবাদি পশু চুরির উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় গ্রামবাসী সতর্ক অবস্থায় ছিল। রোববার ভোরে একটি ট্রাক নিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি গ্রামে প্রবেশ করলে এলাকাবাসী তাদের ঘিরে ফেলে। কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তিনজনকে হাতেনাতে ধরে গণধোলাই দেওয়া হয়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু ঘটে। কালিয়াকৈর থানার ওসি শহীদুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এক নজরে গাজীপুরের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড
| ঘটনা ও স্থান | নিহতের সংখ্যা | সম্ভাব্য কারণ | বর্তমান অবস্থা |
| কাপাসিয়া (রাউৎকোনা) | ৫ জন (একই পরিবারের) | পারিবারিক কলহ ও আর্থিক বিরোধ | প্রধান অভিযুক্ত পলাতক; পুলিশি তদন্ত চলছে। |
| কালিয়াকৈর (বাঘচালা) | ৩ জন | গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনি | মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে; তদন্তাধীন। |
| মোট নিহত | ৮ জন | – | – |
জনমনে প্রভাব ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
টানা দুই রাতে আটটি মৃত্যুর ঘটনায় গাজীপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে কাপাসিয়ায় তিনটি অবুঝ শিশুকে হত্যার ঘটনাটি জনমনে গভীর ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই অস্থিরতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশি টহল জোরদার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
