আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড পরিমাণ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ। সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় দেশের সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরের উন্নয়ন কর্মসূচির মোট আকার ধরা হয়েছে তিন লাখ আট হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন এক লাখ নব্বই হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান এক লাখ দশ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে আরও প্রায় আট হাজার নয়শ কোটি টাকা যুক্ত হবে।
Table of Contents
উন্নয়ন কাঠামোর প্রধান দিকসমূহ
নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনা পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর আওতায় প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে পাঁচটি মূল ভিত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার, বৈষম্যহীন উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংহতি বৃদ্ধি।
রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অংশে প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটাল রূপান্তর, বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ
উন্নয়ন বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত। এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে পঞ্চাশ হাজার বায়ান্ন কোটি টাকা। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রায় সাতচল্লিশ হাজার পাঁচশ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে পঁয়ত্রিশ হাজার পাঁচশ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বত্রিশ হাজার ছয়শ কোটি টাকা এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে কুড়ি হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নিচের টেবিলে প্রধান খাতভিত্তিক বরাদ্দ তুলে ধরা হলো—
| খাতের নাম | বরাদ্দ (কোটি টাকা) |
|---|---|
| পরিবহন ও যোগাযোগ | ৫০,০৯২ |
| শিক্ষা | ৪৭,৫৯১ |
| স্বাস্থ্য | ৩৫,৫৩৫ |
| বিদ্যুৎ ও জ্বালানি | ৩২,৬৯১ |
| গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা | ২০,৩৬১ |
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ ও থোক অর্থ
স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ তেত্রিশ হাজার সাতশ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ পেয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ পেয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার সাতশ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বিদ্যুৎ বিভাগও বড় অঙ্কের বরাদ্দের আওতায় রয়েছে।
তবে এবারের উন্নয়ন কর্মসূচিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো থোক বরাদ্দের ব্যাপক বৃদ্ধি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিশেষ সহায়তা খাতে মোট প্রায় এক লাখ আঠারো হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পভিত্তিক নির্দিষ্ট ব্যবহার নেই এমন অর্থের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য।
সামাজিক সুরক্ষা ও নতুন উদ্যোগ
সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবার কার্ড কর্মসূচির জন্য এক হাজার চারশ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষক কার্ড কর্মসূচিতে প্রায় এক হাজার চারশ কোটি টাকা এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের দায়িত্ব পালনকারীদের সম্মানী বাবদ এক হাজার একশ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি
নতুন উন্নয়ন কর্মসূচিতে এক হাজার একশর বেশি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ প্রকল্প, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রকল্প। পাশাপাশি আরও এক হাজারের বেশি নতুন প্রকল্প পর্যায়ক্রমে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি অর্থবছরের নয় মাসে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার মাত্র ছত্রিশ শতাংশের কাছাকাছি। এ পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এত বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দক্ষতা ও অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সরকারের প্রত্যাশা, এই উন্নয়ন কর্মসূচি দেশের অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
