বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইনের শাসনের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে লেখা এক খোলাচিঠিতে জন-আস্থা পুনরুদ্ধারে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার লন্ডনে সংস্থাটির সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এই চিঠিতে নির্বাচনের প্রাক্কালে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক উদ্বেগের ক্ষেত্রসমূহ
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অন্তর্বর্তী প্রশাসন বেশ কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলোর বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন (এটিএ)’-এর ক্রমাগত অপব্যবহার এবং ভিন্নমত দমনের প্রচেষ্টা সংস্থাটির দৃষ্টিগোচর হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনের আগে কয়েক সপ্তাহ সরকারের জন্য একটি ‘চূড়ান্ত পরীক্ষা’, যেখানে তাদের প্রমাণ করতে হবে তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কি না।
নিচে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বেগের প্রধান কারণ ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:
| উদ্বেগের বিষয় | সংশ্লিষ্ট ঘটনা ও বিবরণ |
| মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা | সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম (পান্না) ও আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার। |
| গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ | গত ১৮ ডিসেম্বর দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা। |
| ব্যক্তিনিরাপত্তার অভাব | নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তা এবং সহিংসতা রোধে প্রশাসনের ব্যর্থতা। |
| সংখ্যালঘু সুরক্ষা | ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা। |
| আইনি বাধ্যবাধকতা | নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) বাস্তবায়নে ঘাটতি। |
সাংবাদিকদের ওপর দমনপীড়ন ও আইনি অপব্যবহার
অ্যাগনেস ক্যালামার্ড তাঁর চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ প্রয়োগ করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের আগস্টে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলমকে সরকার উৎখাতের চেষ্টার অভিযোগে এবং ডিসেম্বরে আনিস আলমগীরকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগে আটক করা হয়। অ্যামনেস্টির মতে, এই গ্রেপ্তারগুলো সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী এবং এটি মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার একটি কৌশল।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতি সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রধান উপদেষ্টার সরকারের প্রতি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছে:
১. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের জন্য কোনো নাগরিককে যেন জীবনের ভয়ে থাকতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. অবাধ অংশগ্রহণ: রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে, তার পরিবেশ তৈরি করা।
৩. বিচারের শাসন: গণপিটুনি এবং গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।
৪. আইনের সংস্কার: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করে এমন কালো আইনগুলোর অপব্যবহার বন্ধ করা।
মহাসচিব ক্যালামার্ডের মতে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে নাগরিকদের নির্ভয়ে কথা বলার অধিকার দিতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন যে, মৌলিক স্বাধীনতার ওপর বেআইনি বিধিনিষেধ কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করে না, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের দীর্ঘমেয়াদী আস্থাও কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় দেওয়ার এখনই সময়।
