খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই মার্চ ২০২৬, ৭:৭ এএম

বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের নির্মাণ সামগ্রীর বাজারে। বিশেষ করে রড বা ইস্পাত শিল্পে গত কয়েক দিনে যে দামের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে, তাতে সাধারণ ক্রেতা ও আবাসন ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত সোমবার পর্যন্ত দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর রডের দাম প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রডের বর্তমান দাম যে গতিতে বাড়ছে, তাতে অচিরেই তা টনপ্রতি এক লাখ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে।
রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হলো বিশ্ববাজারে কাঁচামালের সংকট এবং জাহাজভাড়া বৃদ্ধি। রড তৈরির প্রধান উপাদান হলো লোহার টুকরা বা ‘স্ক্র্যাপ’। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এই স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি প্রায় ৫০ মার্কিন ডলার বা ৬,০০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বিমা খরচ ও জাহাজভাড়া কয়েকগুণ বেড়েছে। এর পাশাপাশি দেশীয় জাহাজভাঙা শিল্পে ব্যবহৃত স্ক্র্যাপের দামও টনপ্রতি প্রায় ৩,০০০ টাকা বেড়ে এখন ৫৭ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
দেশের বাজারে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর রডের বর্তমান ও পূর্বের দামের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| ব্র্যান্ডের নাম | যুদ্ধের পূর্বের দাম (টনপ্রতি) | বর্তমান বাজার দর (টনপ্রতি) | মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ |
| বিএসআরএম (BSRM) | ৮৪,৫০০ টাকা | ৯৪,৫০০ টাকা | ১০,০০০ টাকা |
| একেএস (AKS) | ৮৩,০০০ টাকা | ৯৩,০০০ টাকা | ১০,০০০ টাকা |
| জিপিএইচ (GPH) | ৮২,০০০ টাকা | ৯২,০০০ টাকা | ১০,০০০ টাকা |
| কেএসআরএম (KSRM) | ৮১,০০০ টাকা | ৯০,০০০ টাকা | ৯,০০০ টাকা |
| এইচএম স্টিল (মাঝারি) | ৭৯,০০০ টাকা | ৮৯,০০০ টাকা | ১০,০০০ টাকা |
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় স্ক্র্যাপের প্রায় ৯৩ শতাংশ সরাসরি বিদেশ থেকে আমদানি করে। গত ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৫৩ লাখ টন স্ক্র্যাপ আমদানি করা হলেও চলতি বছরের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে স্ক্র্যাপ আমদানির পরিমাণ ছিল ৩.২৪ লাখ টন, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, লোহিত সাগরে সংকটের কারণে নতুন করে এলসি (LC) খোলা বা জাহাজ বুকিং দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের হাতে পর্যাপ্ত কাঁচামাল মজুত না থাকায় উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্ক্র্যাপ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘জাগুয়ার রিসোর্সেস অ্যান্ড ক্যাপিটালের’ পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, যুদ্ধের আগে জাহাজভাড়াসহ স্ক্র্যাপের দাম ছিল টনপ্রতি ৩৬০ ডলার, যা বর্তমানে ৪১০ ডলারে পৌঁছেছে। বাড়তি ভাড়ার কারণে অনেক সরবরাহকারী দেশ নতুন করে চুক্তি করতে অনীহা প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে অনেক কোম্পানি লোকসান দিয়ে রড বিক্রি করেছে। কিন্তু এখন জ্বালানি তেল, ডলারের ঊর্ধ্বগতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় সমন্বয় ছাড়া আমাদের উপায় নেই।” অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, গত মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে বড় ব্র্যান্ডগুলোর দাম টনপ্রতি ১০ হাজার টাকা বাড়ায় পাইকারি বাজারে ক্রেতা কমে গেছে।
রডের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে সরকারি-বেসরকারি বহু উন্নয়ন প্রকল্প ও ব্যক্তিপর্যায়ে বাড়ি নির্মাণের কাজ থমকে যেতে পারে। নির্মাণ খাতের এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আবাসন ব্যবসায় বড় ধরনের মন্দার আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য