মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিজি) অ্যাশেজের বক্সিং ডে টেস্টটি ক্রিকেটীয় ব্যাকরণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জন্ম দিয়েছে এক নতুন ইতিহাসের। মাত্র দুই দিন স্থায়ী হওয়া এই টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার দর্প চূর্ণ করে ইংল্যান্ড ৫ উইকেটে জয়ী হয়েছে। এই জয় কেবল একটি ম্যাচের জয় নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘ ৫,৪৬৮ দিনের এক দুঃসহ অপেক্ষার অবসান। আধুনিক ক্রিকেটের গতিশীলতার সাথে তাল মিলিয়ে মেলবোর্নের উইকেট যেভাবে বোলারদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।
Table of Contents
প্রযুক্তির বিবর্তন ও ইংল্যান্ডের দীর্ঘ অপেক্ষা
২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি ইংল্যান্ড শেষবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছিল। সময়টি কতটা দীর্ঘ ছিল, তা প্রযুক্তির বিবর্তন থেকেই আঁচ করা যায়। সেই সময় অ্যাপল বাজারে এনেছিল তাদের ‘আইফোন ৪’ মডেলটি, আর আজ ইংল্যান্ড যখন পুনরায় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জিতল, তখন দুনিয়া শাসন করছে ‘আইফোন ১৭ প্রো-ম্যাক্স’। টেনিস কিংবদন্তি নোভাক জোকোভিচ ২০১১ সালে যখন মাত্র ১টি গ্র্যান্ড স্লামের মালিক ছিলেন, আজ তাঁর অর্জনের তালিকায় রয়েছে ২৪টি শিরোপা। বর্তমান ইংল্যান্ড দলের প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাটার জ্যাকব বেথেল, যিনি দ্বিতীয় ইনিংসে সর্বোচ্চ ৪০ রান করেছেন, ২০১১ সালের সেই জয়ের সময় তিনি ছিলেন মাত্র ৭ বছরের এক শিশু।
অস্ট্রেলিয়া দলে কেবল স্টিভ স্মিথ এবং উসমান খাজা—এই দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ২০১১ এবং ২০২৫ সালের এই বিরল হারের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছেন। মাঝখানের ১৪ বছরে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে অনেক পালাবদল এলেও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি জয়ের জন্য তাদের হাহাকার শেষ হলো এই মেলবোর্ন টেস্টে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় মেলবোর্ন টেস্ট
| ক্যাটাগরি | তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| টেস্টের স্থায়িত্ব | ৮৫২ বল (মাত্র ২ দিন) |
| পতনের মোট উইকেট | ৩৬টি |
| প্রতি উইকেটে গড় রান | ১৫.৮৮ রান |
| অপেক্ষা ফুরানোর সময় | ৫,৪৬৮ দিন |
| সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর | ৪৬ (ট্রাভিস হেড) |
| দর্শক সমাগম (১ম দিন) | ৯৪,১৯৯ জন (নতুন বিশ্ব রেকর্ড) |
ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা ও বোলারদের দাপট
পুরো টেস্ট ম্যাচে দুই দলের কোনো ব্যাটসম্যান একটি হাফ সেঞ্চুরিও করতে পারেননি। ১৯৩২ সালের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। ট্রাভিস হেডের ৪৬ রানই ছিল পুরো ম্যাচের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সংগ্রহ। টেস্ট ইতিহাসে মাত্র চতুর্থবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো ম্যাচ দুই দিনে শেষ হওয়ার নজির তৈরি হলো। বিস্ময়কর তথ্য হলো, ১৮৯৫-৯৬ মৌসুমের পর এই প্রথম কোনো টেস্ট সিরিজে একাধিক ম্যাচ মাত্র দুই দিনে শেষ হওয়ার ঘটনা ঘটল। ৮৫২ বলের এই ম্যাচটি এমসিজির ইতিহাসে ১৯৩২ সালের পর সবথেকে সংক্ষিপ্ত টেস্ট হিসেবে নথিবদ্ধ হয়েছে।
দর্শকের নতুন মাইলফলক
ম্যাচটি ব্যাটে-বলে দীর্ঘস্থায়ী না হলেও গ্যালারিতে উন্মাদনার কমতি ছিল না। বক্সিং ডের প্রথম দিনে মেলবোর্নে রেকর্ড ৯৪,১৯৯ জন দর্শক উপস্থিত হয়েছিলেন, যা ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের ৯৩,০১৩ জন দর্শকের বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দেয়। দ্বিতীয় দিনেও ৯২,০৪৫ জন দর্শকের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে অ্যাশেজের জনপ্রিয়তা এখনো কতটা আকাশচুম্বী।
এই জয়টি ইংল্যান্ডের জন্য কেবল একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়, বরং অজি দূর্গে পুনরায় নিজেদের আধিপত্য প্রমাণের এক অনন্য দলিল। ৩৬ উইকেটের পতন আর দুই দিনের রুদ্ধশ্বাস লড়াই ক্রিকেটপ্রেমীদের আজীবন মনে থাকবে।
